বণিক বার্তার ১৬ বছরে পদার্পণ

সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনই সুসাংবাদিকতা

পনেরো বছর পেরিয়ে ষোলোতে পা দিয়েছে বণিক বার্তা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা দমন-পীড়ন, আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, কর্মীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার উত্তরাধিকার বহন করে আসছে।

রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের পুঁজি এবং নানা আইনি প্রতিবন্ধকতা প্রায়ই বস্তুনিষ্ঠ, স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গড়ার পথে চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয়েছে। বণিক বার্তা শুরু থেকেই এসব চ্যালেঞ্জকে পথচলার অংশ হিসেবে নিয়েছে এবং সঠিক তথ্য জানার জনগণের অধিকারকে সমর্থন করে এসেছে।

যাত্রার শুরুতে বণিক বার্তার ট্যাগ লাইন ছিল ‘সমৃদ্ধির সহযাত্রী’। এক দশকের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে আমরা ট্যাগ লাইন রেখেছিলাম ‘তথ্যেই অগ্রগতি’। পনেরো বছর পেরিয়ে আমরা আজ নতুন ট্যাগ লাইন রেখেছি ‘সঠিক তথ্যই সুসাংবাদিকতা’। সঠিক তথ্যই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি, যা সাধারণ প্রতিবেদনকে জনসাধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদের উৎসে পরিণত করে। ভালো সাংবাদিকতা শুধু শিরোনাম প্রচারে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যেকোনো ঘটনা যাচাই-বাছাইয়ে পেশাগত শৃঙ্খলা অনুসরণ করার দায় সাংবাদিককে নিতে হয়। এক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে নির্ভুল তথ্য তুলে ধরাকে গুরুত্ব দেয়া বেশি জরুরি। তবে গণমাধ্যমের ভুল হয়ে থাকতে পারে। যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম কোনো ভুল করলে তা স্বীকার করে দ্রুত সংশোধন করে এবং সে তথ্যও পাঠককে যথাসময়ে জানিয়ে থাকে।

সংবাদপত্রসহ সকল নিউজ মিডিয়া রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলেও গণমাধ্যম কর্মীদের সম্পর্কে জনমনে এক ধরনের খণ্ডিত ধারণা রয়েছে। এ পেশায় আর্থিক নিরাপত্তা কম। চাকরির অনিশ্চয়তা ও উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অভাব রয়েছে। জনমনে এসব ধারণা প্রবলভাবে শক্তিশালী। যদিও সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা, তবে প্রায়ই তা উপভোগ্য ও শ্রমসাধ্য। এ পেশায় কৌতূহল মেটানো, ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর হওয়ার মাধ্যমে কেউ কর্মজীবনে সফল হতে পারেন। একজন সাংবাদিক অকথিত বা উপেক্ষিত ঘটনা তুলে ধরেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হয়ে ওঠেন এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে অনেক অজানা ঘটনার টুকরো টুকরো বিষয়কে সংগ্রহ করে মানুষের তথ্যের ক্ষুধা মেটান। এ কাজ করার জন্য তার সৃজনশীল অভিব্যক্তি রাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করে। শেষে তা হয়ে ওঠে জনগণের কণ্ঠ। সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার প্রথম কয়েক বছর কঠোর পরিশ্রম, কাজের চাপ এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিকের সংকট থাকলেও সাংবাদিককে তার মনোযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধরে রাখতে হয়। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা হয়ে ওঠে তার পেশাগত প্রাণশক্তি। পেশাগত জীবনের পরবর্তী ধাপে তিনি যখন বিশেষীকরণ পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করবেন তখন অর্জিত দক্ষতা অনেক মূল্যবান হয়ে ওঠে। ফলে এ পেশায় উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে ধৈর্য ও যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে নিজেকে দক্ষ করে তোলায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যাকে সবসময় পারিশ্রমিকের মাণদণ্ডে বিচার করা যাবে না। কেননা এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্মান ও পেশাগত তৃপ্তিরও বড় প্লাটফর্ম।

সাংবাদিকতায় আর্থিক সংকট রয়েছে—এ কথা সত্য। তবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে এবং কর্মীদের দক্ষ করে সুসাংবাদিকতার অনুশীলন করতে পারলে এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণ সম্ভব। সুসাংবাদিকতার স্বার্থেই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী হতে হবে। এজন্য পাঠকের আস্থা গণমাধ্যমের বড় সম্পদ। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক রঙমুক্ত থাকার বিষয়ে বণিক বার্তা শুরু থেকেই সতর্ক থেকেছে। পাঠকের আর্থিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী মহলকে পরামর্শ এবং জবাবদিহির আওতায় আনাকে আমরা আমাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেছি।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝাঁকুনি ছাড়াও বৈশ্বিক সংকট, গণ-অভ্যুত্থানকালীন ও তৎপরবর্তী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বেকার কর্তৃত্ববাদী শাসন কাঠামো সাংবাদিকদের কাজ কঠিন করে তুলেছিল। তবে ১৫ বছরের যাত্রায় সংকটকালেও পাঠকের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের দায় থেকে সরে আসিনি।

নানা কারণে চলতি বছর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও অচলাবস্থা শেষে নতুন নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। বর্তমানে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, সেখানে তথ্য, বিশ্লেষণ, পরামর্শ এমনকি নীতি আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখার বিষয়টি আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে। এজন্য আমরা প্রতিনিয়ত বিশেষ আয়োজন, বিশেষ প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার, সংলাপ এবং বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে পলিসি কনক্লেভের আয়োজনে গুরুত্ব দিচ্ছি।

কেবল সাংবাদিকের ব্যক্তিগত কর্তব্যবোধ গণমাধ্যমের জন্য যথেষ্ট নয়। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ছাড়া গণমাধ্যম টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ভালো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আর্থিক ভিত্তি এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অনুশীলনের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেয়ার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ থাকে। বণিক বার্তা বিগত পনেরো বছর ধরে তার পথচলায় এসব কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে উত্তরোত্তর নিজের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তথ্যকে শিল্পের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টিকে আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকি। পাঠকের কাছে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে আমরা সতর্কভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখেছি। পনেরো বছরের পথচলা আমাদের দায়িত্বশীল করেছে এবং ভবিষ্যতে টিকে থাকার অনেক শিক্ষা দিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে তথ্যই শক্তি। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োজনীয় ও নির্ভুল তথ্য ছাড়া শিল্পায়িত ও প্রযুক্তিনির্ভর কোনো নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, অগ্রগতি আর সম্ভব নয়। অন্যদিকে তথ্যের প্রাচুর্য আবার শঙ্কাও জাগিয়েছে। কারণ ভুল তথ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে দেরি করে না। তাই আমরাও সতর্ক। প্রতিদিনই পাঠকের প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ছাপার অক্ষরে ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে সরবরাহ করতে আমরা দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ। এ সংকল্প ও অঙ্গীকারের কারণে বণিক বার্তা পাঠকের কাছে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। ভবিষ্যতেও বণিক বার্তা প্রমাণনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তার পথচলা অব্যাহত রাখবে।

আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন—এ আশাবাদ আমাদের।

আরও