‘জরাজীর্ণ’ সরকারি কলোনিতে বেড়ে উঠছে কিশোর অপরাধী থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে মতিঝিল ও নিউমার্কেট এলাকা

দুই বন্ধু রিফাত ও জনি। গত ২৩ মার্চ রাত ৮টার পর কমলাপুর থেকে মতিঝিলের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় এজিবি কলোনির সামনে ছিনতাইকারীদের আক্রমণের মুখে পড়েন।

পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে কলোনির ভেতরে ঢুকে পড়ে। সরজমিনে অনুসন্ধান, বাসিন্দাদের বক্তব্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, রাজধানীর এ সরকারি কলোনির প্রায় বসবাস অনুপযোগী জরাজীর্ণ অনেক ভবন, স্থাপনা, নির্জন স্থান ব্যবহার করে ছিনতাইকারী, অস্ত্র ও মাদক কারবারি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধীরা সহজেই তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। শুধু এজিবি নয়, আজিমপুর সরকারি কলোনির পুরনো অনেক ভবনও ব্যবহার করছে স্থানীয় অপরাধীরা। এতে রাজধানীর মতিঝিল, নিউমার্কেটসহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্লেষকরা।

মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় পশুর হাটের ইজারা নিয়ে গুলি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধকর্মে বেশ কিছুদিন ধরে উঠে আসছিল তানিম রেজা ওরফে বাপ্পীর নাম। ১৭ জুলাই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মতিঝিল এলাকার এ ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র শৈশব-কৈশোর কেটেছে এজিবি কলোনিতে। বাপ্পীর কিশোর গ্যাংয়ের যাত্রা শুরু হয় এ কলোনির মাঠ থেকেই। পরবর্তী সময়ে মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায় ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধ সংঘটিত করে বাপ্পী চলে আসত এজিবি কলোনিতে। মূলত এজিবি কলোনির বিস্তৃত আয়তন এবং অসংখ্য জরাজীর্ণ ভবনে কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। পাশাপাশি এখানকার অনেক নির্জন স্থান, ঝোপঝাড়, জরাজীর্ণ ভবনে অবৈধ অস্ত্র সংরক্ষণ করা যায় সহজে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কলোনিতে প্রায় রাতেই ফাঁকা গুলির শব্দ পাওয়া যায়।

দেশভাগের পর সরকারি চাকরিজীবীদের আবাসনের জন্য মতিঝিলে এজিবি কলোনি নির্মাণ করা হয়। অডিটর জেনারেলের অফিসের নামে এ কলোনির নামকরণ করা হয় এজিবি কলোনি। প্রায় ২৮৪ বিঘার জমির ওপর নির্মিত এ কলোনিতে রয়েছে চারতলা বিশিষ্ট ১৬৫টি ভবন। পাশাপাশি রয়েছে তিনটি ২০ তলা ভবন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত ১০ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এ কলোনি তিনটি জোনে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল জোন, আল হেলাল জোন ও আইডিয়াল জোন। এসব জোনে নয়টি স্কুল, দুটি মাদরাসা এবং দুটি কলেজ রয়েছে। এছাড়া কাছাকাছি রয়েছে পোস্টাল কলোনি, টিঅ্যান্ডটি কলোনি, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি।

সম্প্রতি এজিবি কলোনিতে সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথে একটি গেট থাকলেও সেটি সার্বক্ষণিক খোলা থাকে। কোনো নিরাপত্তাকর্মী সেখানে ছিলেন না। ইচ্ছামতো সবাই যাতায়াত করতে পারে। প্রায় ৭৬ বছরের পুরনো কলোনির সড়কগুলো ভাঙাচোরা। অধিকাংশ সড়কেই জমে রয়েছে পানি। ড্রেনেজ ব্যবস্থারও বেহাল দশা। অনেক ভবন হারিয়েছে বাসযোগ্যতা। চারিদিকে উন্মুক্ত জায়গায় তৈরি হয়েছে ঝোপঝাড়। এর মধ্যেই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আড্ডা দিচ্ছে কিশোররা। তাদের অনেকেই বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

কলোনির এক প্রবীণ বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, ‘আড্ডা দেয়া কিশোররা কেউই কলোনির না, বহিরাগত। দিনের বেলা তো থাকেই, রাতে আরো বেশি সংখ্যায় জড়ো হয় এ কিশোররা। কখনো কখনো রাতভর চলে তাদের গান-বাজনা, মাদক সেবন। এরা দিনের বেলা প্রভাবশালীদের লাঠিয়াল হয়ে ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদাবাজি করে। কেউ কেউ মাদক ও অস্ত্রের কারবারও করে।’

এজিবি কলোনির প্রধান ফটকের পাশে কথা হয় কলোনির আরেক প্রবীণ বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই দশক ধরে এ কলোনিতে আছি। বহিরাগতদের আনাগোনা এখানকার নিয়মিত দৃশ্য। এসব বহিরাগতের পাল্লায় পড়ে কলোনির অনেক ছেলে-মেয়ে বিপথগামী হয়েছে।’

মতিঝিলের অনেক এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও এজিবি কলোনিতে তা নেই। এ কারণে অপরাধীরা সেখানে অনেকটা নিরাপদে অবস্থান করতে পারে। নাজমুল হাসান নামের মতিঝিলের এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হলেও মতিঝিলে ঢাকার অন্য এলাকাগুলোর চেয়ে চাঁদাবাজদের তৎপরতা বেশি। দিনেদুপুরে অস্ত্রসহ মহড়া চলে। পুলিশকে জানালেও খুব একটা কাজ হয় না। এসব অপরাধী দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থান ত্যাগ করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের উপস্থিতিতে দফায় দফায় অভিযান চালিয়েও তাদের আর চিহ্নিত করা যায় না। এখানে যারা চাঁদাবাজি করতে আসে তাদের বড় অংশই দিনের বেলায় কলোনিতে গা ঢাকা দিয়ে থাকে। রাতে আশপাশে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে পুনরায় কলোনিতে ফিরে যায়।

এজিবি কলোনির জরাজীর্ণ ভবন

জানতে চাইলে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এত বড় পরিত্যক্ত স্থাপনা তৈরি হওয়াটা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি। তবে আমরা সর্বাত্মকভাবে নজরদারি এবং অভিযান অব্যাহত রেখেছি। এ পরিত্যক্ত কলোনিগুলো নতুন করে যদি বহুতল ভবনে রূপান্তর করা যায়, তখন কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে আসবে। একটা সময় মিরপুরেও এমন অনেক অপরাধ সংঘটিত হতো। পরবর্তী সময়ে সরকার সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করে। এরপর থেকে মিরপুরে কলোনিকেন্দ্রিক অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আশা করি এজিবি কলোনির ক্ষেত্রেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

ঢাকার আরেকটি পুরনো সরকারি আবাসন এলাকা আজিমপুর সরকারি কলোনি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ঢাকায় সরকারি কর্মচারীদের আবাসন সংকট মেটাতে আজিমপুরে এ কলোনি নির্মাণ করা হয়। এটি দেশে বহুতলবিশিষ্ট গুচ্ছ আবাসনের প্রথম প্রকল্প। সরকারি এ কলোনির মোট আয়তন প্রায় ৮৫ একর। কলোনিতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৪৯টি ভবন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে পুরনো ও জরাজীর্ণ অনেক ভবন ভেঙে কলোনির বিভিন্ন জোনে ৯ দশমিক ২৬ একর জমিতে নতুন করে ২০ তলাবিশিষ্ট একাধিক বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

কলোনির বাসিন্দারা জানান, আজিমপুর সরকারি কলোনির কিছু অংশ ও এর আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাং ও বহিরাগত অপরাধীদের আনাগোনা তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলোনির নির্দিষ্ট কিছু অংশে পুরনো ভবন, বিশাল এলাকা এবং সীমানা প্রাচীরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা আশ্রয় নিচ্ছে। কলোনির জোন-সিসহ বিভিন্ন অংশে পুরনো ও ফাঁকা পড়ে থাকা ভবনগুলো অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু কিশোর গ্রুপ কলোনির মাঠ ও নির্জন স্থানগুলো মাদক সেবন এবং ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করে।

চাকরির পড়াশোনার জন্য গত বছর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে এক কর্মকর্তার বাসায় সাবলেট উঠেছিলেন নুসরাত শাওন ও তার এক বান্ধবী। কলোনিতে অনেক কর্মকর্তার বাসায়ই সাবলেট দেয়া হয়। শাওন বলেন, বাসার গলিতে বাইরের কিশোর-যুবকরা আড্ডা দিত। অনেক সময় চুরি-ছিনতাইয়েরও ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে চলতি বছরের শুরু থেকে বাসা ছেড়ে দিয়েছি।

ঢাকার বুকে এ সরকারি কলোনিগুলো জারজীর্ণ দশা ও অব্যবস্থাপনার কারণে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এজিবি কলোনি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। এর চারপাশে মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া, রাজারবাগ, গুলিস্তান ও কমলাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে। বহু বছর ধরেই এখানে অপরাধীদের বিচরণ ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে মতিঝিলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীরা সহজেই এজিবি কলোনির ভেতরে গিয়ে আত্মগোপন করতে পারে। পুরনো সরকারি কলোনিগুলো এখন রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।’

আব্দুল কাইয়ুম আরো বলেন, ‘শুধু অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এসব এলাকায় স্থায়ী নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম শক্তিশালী করতে হবে, যাতে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়।’

মতিঝিল এজিবি কলোনি ও আজিমপুরের সরকারি কলোনির অবকাঠামোগত সার্বিক দেখাশোনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। কলোনিগুলোর পুরনো ভবনের অবকাঠামোগত লাইফটাইম অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মতিঝিল এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। ভবনগুলোর লাইফটাইম অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখানে এখন অনেক পরিত্যক্ত স্থাপনা তৈরি হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছি। এর মধ্যে একটি আল হেলাল জোনে, আরেকটি আইডিয়াল জোনে। প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনাধীন রয়েছে। আজিমপুর সরকারি কলোনির পুরনো ভবন ভেঙে নতুন করে ২০ তলাবিশিষ্ট বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে কলোনি এলাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিটি স্থাপনারই একটা লাইফটাইম থাকে। এরপর সেটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। পরিত্যক্ত হলে সেখানে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। ঢাকার এজিবি ও আজিমপুর কলোনির মতো পুরনো কলোনিগুলো নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর কাজ করছে। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’

আরও