প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ চার বছরের নিচে হওয়া উচিত, এটা নিশ্চিত। আরো কমও হতে পারে। তবে জনগণ কী চায়, রাজনৈতিক দলগুলো কী চায়, সেটাই বড় বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি বলে, সংস্কারের কথা ভুলে যাও, নির্বাচন দাও, তাহলে আমরা সেটাই করব।’
সম্প্রতি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় দেয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস এসব কথা বলেন। আজারবাইজানের বাকুতে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিক নিক ক্লার্ককে এ সাক্ষাৎকার দেন তিনি।
আল জাজিরার সাংবাদিক বলেন, ‘পরবর্তী নির্বাচনের কোনো সময়সীমা আছে কিনা, যেখানে প্রাথমিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। অবশ্য মেয়াদ বাড়ানো হবে বলে আলোচনা চলছে। বাস্তবতাটা কী?’
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘কেউ এটাকে সংক্ষিপ্ত সময় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে বলে কখনো মনে হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারকেই মূল দাবি বলা হচ্ছিল, কারণ ছাত্র আন্দোলনই হয়েছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য। তাদের শব্দটা “নতুন বাংলাদেশ”। কেবল নির্বাচন দিলেই “নতুন বাংলাদেশ” আসবে না।’
সাংবাদিক বলেন, ‘জনগণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি নির্বাচন চায়, বিষয়টা কি তেমন নয়? সংস্কার তো সরকারের ওপর নির্ভর করে।’
এ বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সংস্কার তাদের (জনগণের) ব্যাপার। আমরা সবসময় বলি, আমরা আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করছি। আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দিচ্ছি না। আপনারা যদি বলেন, এগিয়ে যান, নির্বাচন করুন, সংস্কারের কথা ভুলে যান, আমরা নির্বাচনই করব।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাব্য মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা চিরস্থায়ী সরকার নই। উদাহরণস্বরূপ একটি নিয়মিত সরকারের মেয়াদ থাকে পাঁচ বছর। নতুন সংবিধানে তা চার বছর হতে পারে। ফলে এটা নিশ্চিত যে এটি (অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ) চার বছরের নিচে হওয়া উচিত। আরো কমও হতে পারে। জনগণ কী চায়, রাজনৈতিক দলগুলো কী চায়, সেটাই বড় বিষয়।’
সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আপনার সরকার কি চার বছর থাকছে?’ জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি এটা বলিনি যে আমি চার বছর থাকব। আমি বলছি সর্বোচ্চ মেয়াদ চার বছর হতে পারে। কিন্তু সেটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি সম্পন্ন করা।’
নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ আছে কিনা জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘না, আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি যা করছি তা উপভোগ করছি। আমার জীবন শেষ পর্যায়ে, এখন আমি নিজেকে বদলাতে চাচ্ছি না।’
ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং তার দেয়া বিবৃতি প্রসঙ্গে জানতে চায় আল জাজিরা। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বলেছি, আপনারা তাকে আশ্রয় দিয়েছেন সমস্যা নেই। তবে দয়া করে নিশ্চিত করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি না করেন।’
সাংবাদিক বলেন, ‘শেখ হাসিনা এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন।’ তখন প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তিনি নিজেকে অনেক কিছুই ভাবতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতা তেমনটা নয়। এমনকি ভারতও বলছে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী।’
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘হ্যাঁ, সেটার আইনি প্রক্রিয়া চলছে। অভিযুক্ত হলে অবশ্যই তাকে প্রত্যর্পণের জন্য বলা হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে জানতে চাইলে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে আমার কখনো যোগাযোগ হয়নি, তাই ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি যদি রিপাবলিকান পার্টির কথা বলেন, আমার বন্ধু আছে, ডেমোক্রেটিক পার্টিতেও আমার বন্ধু আছে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেই হঠাৎ করে নেতিবাচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এমন নয় যে প্রেসিডেন্ট কে হবেন তার ওপর নির্ভর করে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যাবে।’
প্রধান উপদেষ্টা চার বছরের কথা বলেননি
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর হতে পারে—এমন কথা অধ্যাপক ইউনূস আল জাজিরাকে বলেননি বলে দাবি করেছেন তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হতে হবে। পুরো সাক্ষাৎকার আপনারা (গণমাধ্যমকর্মী) ভালোভাবে শোনেন। ইন্টারভিউয়ে তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) কী বলেছেন? সংবিধান নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে পার্লামেন্টের ডিউরেশন চার বছরে আনা হোক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) কথাটা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি এটা বলেননি।’