চাঁদপুরে মেঘনা নদীর এখলাসপুর থেকে ছটাকি পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জানুয়ারির শেষ দিকে পুরো সপ্তাহজুড়ে প্রচুর মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। স্রোত ও ঢেউয়ে ভেসে নদীর তীরে এসে জমা হয় প্রচুর জাটকা পোনা, পোয়া, বেলে, চিংড়ি, কাঁকড়া, ব্যাঙ, শামুক, ঝিনুকসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী। এ ঘটনার কারণ শনাক্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মেঘনার অববাহিকায় কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এবং বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী দিয়ে ভেসে আসা নানা ধরনের বর্জ্য মিশে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে।
পানি দূষণের কারণে মেঘনায় মাছ ও জলজ প্রাণীর মড়কের এটিই প্রথম নজির নয়। এর আগে ২০২৩ সালেও মেঘনার মতলব উত্তর উপজেলাধীন অংশে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক টন মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। সে সময়ও অনুসন্ধানে একই কারণ উঠে এসেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মেঘনায় গত জানুয়ারির শেষ দিকে মাছ ও জলজ প্রাণীর মড়ক দেখা দেয়ার পর শুরুতেই দূষণের কারণে এ ঘটনা ঘটছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল। এর পর এ ঘটনার তদন্তে ২৭ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মু. সোহরাব আলির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা ৩০ জানুয়ারি মেঘনার বিভিন্ন অংশে দিনে ও রাতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ও তাপমাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি এর মধ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক ও দূষণ উপাদানের উপস্থিতি পরিমাপের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। ৩০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে চাঁদপুরের এখলাসপুর লঞ্চঘাট এলাকা এবং ৩১ জানুয়ারি মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল লঞ্চঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ সময় মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি পরীক্ষার পাশাপাশি জিপিএস রিডিং রেকর্ড করেন তারা।
তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং মেঘনা নদীর মতলব ও চাঁদপুরের বাবুবাজার পর্যন্ত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের উপস্থিতি ছিল গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মিলিত প্রবাহ এবং মেঘনা নামে প্রবাহিত ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীর মিলিত প্রবাহ এলাকায় বিশাল জলরাশিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা খুবই কম। ফলে এ এলাকায় জলজ প্রাণীর জীবনধারণ কঠিন।
শীতলক্ষ্যা নদীর নারায়ণগঞ্জে লঞ্চঘাট থেকে ভাটিতে মেঘনার চাঁদপুরের এখলাসপুর ঘাট পর্যন্ত যেসব পয়েন্ট থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, সব স্থানেই অ্যামোনিয়ামের উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। নাইট্রোজেন হিসাবে অ্যামোনিয়ামকে দেখা হয় নাইট্রোজেনের একটি দূষিত রূপ হিসেবে। মাত্রাতিরিক্ত অ্যামোনিয়া জলজ জীবের বিশেষ করে মাছের জন্য সরাসরি বিষক্রিয়ার কারণ হয়ে দেখা দেয়। একই সঙ্গে তা পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণকেও কমিয়ে দেয়। মেঘনা নদীর পানির সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর অনেক স্থানেই পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া ঘটানোর মতো নাইট্রোজেন হিসেবে অ্যামোনিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া নদীর পানিতে ফসফরাস হিসেবে ফসফেটের উপস্থিতিও ছিল গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। পানিতে ফসফেটের উপস্থিতি মাত্রা ছাড়ালে তা দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর শৈবালের বংশ বৃদ্ধি পায়।
নদীর পানি জলজ পানির জীবনধারণের জন্য ক্রমেই উপযুক্ততা হারানোর কারণ সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, চাঁদপুরের ষাটনল ও বাবুবাজার পর্যন্ত নদীর পানি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা মাছসহ জলজ প্রাণীর জীবনধারণের উপযুক্ত নয়। ঢাকা শহরের শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল-ক্লিনিকের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য, স্যুয়ারেজ বর্জ্য, গৃহস্থালীয় বর্জ্যসহ অন্যান্য উৎস থেকে সৃষ্ট বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষিত করছে। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার সব বর্জ্য মিশছে শীতলক্ষ্যা নদীর পানির সঙ্গে। এসব নদীর দূষিত পানি এসে মিশছে মেঘনায়। সম্মিলিত এ দূষিত পানি মেঘনার পানির গুণগত মানকে কমিয়ে দিয়ে সেখানকার জলজ প্রাণীর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে। মেঘনার ওপর দিয়ে যাওয়া নৌযান থেকে ফেলা স্যুয়ারেজ ও অন্যান্য বর্জ্যও নদীকে আরো দূষিত করছে। এছাড়া নদীর দূষণকে অসহনীয় মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে মেঘনা অববাহিকায় কৃষিতে রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার।
এ প্রসঙ্গে মেঘনা নদীর পানি দূষণের কারণ নিরূপণ-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মু. সোহরাব আলি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেঘনার অববাহিকায় কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গার বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে। নৌযানের স্যুয়ারেজ বর্জ্যও নদী দূষণ করছে। দূষণ রোধে আমরা কিছু মতামত ও সুপারিশ করেছি। সে আলোকে কার্যক্রম পরিচালিত হলে নদীর পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে জনসচেতনতাও দরকার।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি নদীর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূষণ ক্ষমতা রয়েছে। ক্ষমতা নির্ভর করে নদীর ধারণক্ষমতা, উজানের প্রবাহ, অখণ্ডতা, পানির তাপমাত্রা ইত্যাদির ওপর। নদীতে নির্গত দূষণের পরিমাণ তার সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে নদী আর কার্যক্ষম থাকে না। মেঘনাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোয় দূষণ যেভাবে মাত্রা ছাড়িয়েছে, তা নদীর স্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
মেঘনার প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আটটি সুপারিশ করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যিক বা শিল্প খাতে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করা, শিল্প-কারখানায় জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (শূন্য তরল নিঃসরণ) পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইটিপি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, নদী দখল ও দূষণমুক্ত রাখা, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘নদীর পানিতে দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে তা শুধু মাছ নয়, জলজ অন্যান্য প্রাণীর জন্যও হুমকিস্বরূপ। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূন্য হলে মাছের মড়ক দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে শিল্প-কারখানার বর্জ্য। প্রথমে এ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে।’
মেঘনার উৎপত্তি আসামের পার্বত্য অঞ্চলে। আসাম থেকে প্রবাহিত বরাক নদ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটির শেরপুরের কাছে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বিভক্ত হয়েছে। এরপর সিলেটের ওপর দিয়ে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তে এ দুই নদী মিলিত হয়ে কালনী নামে কিছুদূর অগ্রসর হয়েছে। ভৈরব বাজারের কাছে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলে তা মেঘনা নাম ধারণ করেছে। এর পর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে চাঁদপুরের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা হয়ে মেঘনা নামেই বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। মেঘনা প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের নদী। বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখানে কার্পজাতীয় মাছ অর্থাৎ রুই, কাতল, মৃগেল, কালবাউশ এসব মাছ ডিম ছাড়ে এবং নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। মেঘনা দূষণের কারণে এখানে শুশুকের সংখ্যাও এখন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
মতলব উত্তর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তা তারা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করেই দিয়েছে। স্যুয়ারেজ বর্জ্য, রাসায়নিক উপাদান, বিভিন্ন নৌযান থেকে সৃষ্ট বর্জ্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য বিষ হিসেবে কাজ করে। মাছের বংশবিস্তারকে ব্যাহত করে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে নদীর দূষণমুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য।’