অনুমোদনহীন ও নকশা-বহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যশোর পৌরসভা শুধু তালিকা তৈরি ও নোটিস দিয়েই দায়িত্ব সারছে। আইন অনুযায়ী নির্মাণ বন্ধ, অবৈধ অংশ অপসারণ কিংবা ভবন ভেঙে ফেলার সুযোগ থাকলেও এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। কর্তৃপক্ষের এমন নমনীয়তার সুযোগে অননুমোদিত ও নকশা-বহির্ভূত বহুতল ভবনের শহরে পরিণত হচ্ছে যশোর।
অভিযোগ রয়েছে, পৌর এলাকায় ইচ্ছেমাফিক বহুতল ইমারত গড়ে তুলছেন ডেভেলপাররা। পৌরসভার অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই নিজেদের মর্জিমাফিক নকশায় ভবন নির্মাণ করছেন তারা। এক্ষেত্রে ডেভেলপারদের নোটিস দেয়া ও ভবনগুলোর সামনে সতর্কীকরণ নোটিস সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানো ছাড়া দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পৌর কর্তৃপক্ষ। পৌরসভার পক্ষ থেকে ভবনের ফাউন্ডেশন টেস্ট করিয়ে পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ তা করেনি।
বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২ অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া বা শর্ত ভঙ্গ করে নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ বন্ধ, ভবন বা এর অংশবিশেষ অপসারণ কিংবা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়ার বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে জরিমানা ও অতিরিক্ত ফি দিয়ে অনুমোদন নেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
যশোর পৌরসভা সূত্র জানায়, শহরের নয়টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন ও নকশা-বহির্ভূত ভবনের সংখ্যা ১৪৪। তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে দাবি পৌরবাসীর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব নিয়ম লঙ্ঘনের বেশির ভাগেরই খবর রাখেন না সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে উৎকোচের বিনিময়ে অনিয়ম সামাল দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার কয়েকজন প্রকৌশলীর নকশার ফার্ম রয়েছে। এতে কাজ দ্রুত ও ইচ্ছেমাফিক করার জন্য জমির মালিকরা তাদের দিয়েই নকশা করিয়ে নেন। আবার ঘুসের বিনিময়ে সার্ভেয়াররা নকশার বাইরে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অনিয়ম আড়ালে সহায়তা করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিধি-বহির্ভূত ভবন নির্মাণ এখন ওপেন সিক্রেট। পৌরসভা থেকে প্ল্যান পাস না করিয়েই ভবন নির্মাণ চলছে। স্থানীয়রা মুখ খুললেও প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চান না। পৌরসভা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনুমোদন না নিয়ে নির্মিত ভবনের অনেক অভিযোগ ফাইল চাপা পড়ে আছে।
শহরের পোস্ট অফিসপাড়ার মুন্সী মিনহাজউদ্দীন সড়কে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পদে পদে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করলেও পৌরসভা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছাড়ার নিয়ম মানা হয়নি। সামনের সড়কঘেঁষে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। নকশায় ছয়তলার অনুমোদন থাকলেও সাততলা নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু ওই ভবনই নয়; শহরজুড়েই দৃশ্যচিত্র এ রকম।
যশোর পৌর এলাকার তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, অনুমোদন না নিয়েই নকশা-বহির্ভূত বহু ভবন তৈরি হয়েছে। অনেকে চারতলার অনুমোদন নিয়ে পাঁচতলা, আবার ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে সাততলা করেছেন। অনেকে সেটব্যাক না মেনে সীমানাঘেঁষে ভবন নির্মাণ করেছেন। কোথাও ড্রেনের ওপর প্রাচীর, আবার কোথাও পৌরসভার জায়গা দখল করে অবকাঠামো গড়া হয়েছে। নথিতে দেখা গেছে, শহীদ মশিয়ূর রহমান সড়কে ডা. শেখ আসিফ ইকবালের জেনেসিস হাসপাতাল ভবনটি পাশের ভবনটির সঙ্গে মিশে আছে। সেটব্যাক না মানার পাশাপাশি দুটি ফ্লোর বাড়ানো হয়েছে। মুজিব সড়ক বাইলেনে ডা. নাজমুল হাসান গংয়ের ভবন এবং বেজপাড়া পিয়ারী মোহন সড়কে ডা. রীনা ঘোষের ভবনের ক্ষেত্রেও একই অনিয়ম করা হয়েছে। চাঁচড়া ডালমিলে লন্ডন ম্যানশন চারতলার অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ হয়েছে।
পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ জানায়, ভবন নির্মাণের আগে প্ল্যান পাস করাতে হয়। এতে নকশা, কত তলা, পার্কিং স্পেস ও ভূগর্ভস্থ জলাধার অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু ডেভেলপার কোম্পানিগুলো অনুমতি না নিয়ে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করেছে। চারপাশে তিন ফুট জায়গা ছাড়ার নিয়ম বা সাবমার্সিবল পাম্প বসানোর অনুমতিও নেয়া হয়নি। ভবন নির্মাণে স্থানীয় সরকার আইন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও বিএনবিসি মানা হয়নি।
জনউদ্যোগ যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমেদ বলেন, ‘নির্মাণের শুরুতেই কাজ বন্ধ করলে এত ভবন গড়ে উঠত না। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে এগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে।’ কমিউনিস্ট লীগের জেলা সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, ‘অবৈধ এসব ভবনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে অনিয়ম বাড়বে।’ যশোর নাগরিক সংঘের সমন্বয়ক আলী আজম টিটো নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকদের নিয়ে তদারকি কমিটি গঠনের কথা বলেন।
যশোর পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ সুলতানা সাজিয়া বণিক বার্তাকে জানান, সরকারি রাস্তা, ড্রেন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের সময় অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলা বা অপসারণ করা হয়। তবে অনুমোদনহীন ও নকশা-বহির্ভূত ভবনের ক্ষেত্রে নোটিস দিয়ে সতর্ক করা ছাড়া এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না।
বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২-এর বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগের বিষয়ে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) শিকদার মোকলেচুর রহমান জানান, হেলে পড়া একটি ভবন ভেঙে ফেলার নোটিস দেয়া হলে বাড়ির মালিক উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরবর্তী সময়ে যশোর আদালতে মামলা করেছেন।
অনুমোদনবিহীনভাবে ডেভেলপারদের নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়ে তিনি জানান, ফাউন্ডেশন টেস্ট করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ তা করেনি।