ফেনীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ সাত বছর কারাবন্দী ছিলেন কামরুন নাহার মনি। কারাগারে থাকা অবস্থায় সন্তান জন্ম দেন তিনি। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে জীবনের প্রথম সন্তান জন্মদান এবং তার লালন-পালনসহ সবকিছুই ঘটেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে। ফলে মা কামরুন নাহার মনির সঙ্গে শিশু মোবাস্বেরা খানম রাথির শৈশবের সাতটি বছর কারাগারেই কেটেছে।
হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়ে গতকাল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান কামরুন নাহার মনি। এসময় সাত বছরের কারাজীবনের কথা মনে করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মনি জানান, কারাগারে মেয়েকে নিয়ে তার জীবন কেটেছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। মেয়েকে মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতে দিতেন। বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে পড়াতেন। মা হিসেবে তার ও মেয়ের কষ্ট কেউ বুঝতে পারবে না বলেও জানান তিনি।
একইসঙ্গে তাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ফাঁসির আসামি করার বিচার দাবি করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেফতার হন কামরুন নাহার মনি। বিচার চলাকালে তাকে প্রতি কার্যদিবসে আদালতে হাজির করা হয়। তার আইনজীবী একাধিকবার জামিন এবং অন্তঃসত্ত্বা বিবেচনায় ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানালেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন মনি। তার নাম রাখা হয় মোবাস্বেরা খানম রাথি। তবে মনি তাকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন। সন্তানের বয়স যখন মাত্র এক মাস, তখন ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নিম্ন আদালত মনিসহ ১৬ আসামিকে ফাঁসির রায় দেন। এরপর দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে মনিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ কারাবাসের সময় আদালতের কাছে মনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) হেফাজতে তাকে নির্যাতন করা হয় এবং পেটে লাথি মেরে সন্তান নষ্ট করার হুমকি দিয়ে জবানবন্দি আদায় করা হয়। কিন্তু অধস্তন আদালতের রায়ের পর তাকে দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় ফাঁসির সেলেই কাটাতে হয়। এসময় পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় শিশুটি মায়ের সঙ্গে বড় হয়। পরিবারের আর্থিক সংকট ও ঋণের কারণে নাতনিকে দেখতে যেতে পারতেন না মনির মা নূর নাহার।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত ১০ আসামিকে খালাস দেন, যাদের মধ্যে কামরুন নাহার মনি অন্যতম। অন্য দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন মনির স্বামী রাশেদুল আলম খান। তিনি জানান, বাবা হয়েও কড়া নিরাপত্তা ও দূরত্বের কারণে মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ তিনি পাননি। ফেনী ও কাশিমপুর কারাগারে শিকল ও জালের ফাঁক দিয়ে মেয়েকে দেখার চেষ্টার কথা স্মরণ করে তিনি আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান।
বাবার সঙ্গে মোবাস্বেরা খানম রাথি
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেয়া হয়। পরে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে নুসরাতের ভাই সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষেই হাইকোর্ট সম্প্রতি এই রায় প্রদান করেন।