২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও প্রভাবশালী বহু নেতার বাসভবনে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রায় দুই বছর পরও দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব বাড়ির অধিকাংশই সংস্কার হয়নি। কোথাও ধ্বংসাবশেষ হিসেবে, কোথাও তালাবদ্ধ অবস্থায় এসব ভবন অতীতের ক্ষমতা ও প্রভাবের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
একইভাবে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অনেক আলোচিত নেতা, যারা এরই মধ্যে প্রয়াত হয়েছেন কিংবা যাদের উত্তরসূরিরা সক্রিয় রাজনীতিতে নেই, তাদের বাসভবনও সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব হারিয়েছে। একসময় রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর থাকা সেসব বাড়ির অনেকগুলো আজ নির্জন। কোথাও সীমিত পরিসরে দেখভাল করা হচ্ছে, কোথাও আবার উত্তরাধিকারীদের অনাগ্রহ, রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান কিংবা সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে গেছে আগের জৌলুস। ফলে বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এসব বাসভবনের একটি বড় অংশই আজ ইতিহাস ও স্মৃতির ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজধানীর বনানী, গুলশান ও ধানমন্ডি থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, নাটোর, ফেনী, মাদারীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নড়াইলসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে।
রংপুর নগরীর দর্শনা এলাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া ‘পল্লী নিবাস’ এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। একসময় নেতাকর্মী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর এ বাসভবনে এখন মানুষের আনাগোনা খুবই কম। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের ভেতর-বাইরে আগাছা জন্মেছে। বর্তমানে পাঁচজন কর্মী বাসভবনটির দেখাশোনা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। পাহারাদার জিয়াউর জানান, এরশাদ জীবিত থাকাকালে দিন-রাত মানুষের ভিড় লেগে থাকত, কিন্তু এখন সেই চিত্র আর নেই। স্থানীয়রাও বলছেন, একসময় দরিদ্র মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমাগম থাকলেও বর্তমানে পল্লী নিবাস প্রায় জনমানবশূন্য।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পৈতৃক বাসভবন এখন আর পারিবারিক আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। বর্তমানে ভবনটির নিচতলায় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাসভবনটি ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে সংস্কার করে এর একটি অংশ স্কুলের জন্য ভাড়া দেয়া হয়। ভবনের নিচতলায় শিক্ষা কার্যক্রম চললেও ওপরের তলা এখনো অব্যবহৃত রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই জিল্লুর রহমানের পরিবার ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফলে ভৈরবের বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ীভাবে বসবাসের বাইরে ছিল। তার ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন রাজনৈতিক কারণে মাঝে মধ্যে সেখানে যেতেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবারের কাউকে বাড়িটিতে দেখা যায়নি।
ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞ আইনজীবী এবং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিএনপির প্রয়াত নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি এরশাদ সরকারের উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিন দশক ধরে তিনি গুলশান-২-এর ১৫৯ নম্বর বাড়িতে ছিলেন। বাড়িটি ছিল বিশাল আয়তনের, এক বিঘা ১৩ কাঠার। একতলা বাড়িতে বসবাসের ভবন ছাড়াও ছিল খোলা জায়গা। সেখানে গাড়ি পার্কিং ছাড়াও বাঁধাই করা খোলা বসার জায়গা ছিল। আরো ছিল নানা ধরনের গাছ। ২০১৭ সালে বাড়িটির মালিকানা নিয়ে রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পরে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভেঙে ফেলে রাজউক। সেখানে পুলিশের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর তিনি গুলশান-২-এর ৫১ নম্বর সড়কে নিজস্ব ফ্ল্যাটে ওঠেন। শুধু রাজধানী ঢাকাতে নয়, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটেও রয়েছে পৈতৃক ও নিজস্ব বাড়ি। সেখানে পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িটি দেখাশোনা করেন।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এর ৭১ নম্বর রোডে অবস্থিত শিল্পপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রাসাদসম বাড়িটিও এখন কার্যত নিস্তব্ধ। সরজমিনে দেখা গেছে, বাড়ির ভেতরে চব্বিশের ৫-৬ আগস্টে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ফলে সালমান এফ রহমানের ব্যবহৃত কয়েকটি পোড়া গাড়ি রয়েছে। পোড়া দরজা-জানালাও মূল সড়ক থেকে দেখা যায়। এছাড়া বাড়ির ভেতরে ছয়জন গার্ড অবস্থান করছেন। তারাও বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানির সদস্য। ৫ আগস্টের পর তারা এ বাড়িটি দেখাশোনার দায়িত্ব পান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গার্ড বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়িত্বে এসেছি। মাঝে মাঝে সালমান এফ রহমানের আত্মীয়-স্বজন ও উনার প্রতিষ্ঠানের লোকজন আসেন। এর বাইরে কাউকে আসতে দেখিনি। তবে বাড়িটি সংস্কার করা কিংবা অন্য কোনো কাজ করতে কখনো দেখা যায় না।’
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একসময় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান। তার বোয়ালখালীর পারিবারিক বাড়িটি দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে সেই জৌলুস আর নেই। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের পদচারণায় মুখর ছিল বাড়িটি। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ধীরে ধীরে জৌলুস হারাতে থাকে বাড়িটি। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকায় সেই জৌলুস আর ফেরেনি বাড়িটির।
একসময় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত ছিলেন সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সাবেক এ সংসদ সদস্য গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। তার মিরসরাইয়ের শান্তিরহাটের বাড়িটি এখন সুনসান। প্রতি বছর দুই ঈদ ও বিভিন্ন ছুটির দিনে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মুখর থাকা বাড়িটি বর্তমানে নিস্তব্ধ ও প্রায় পরিত্যক্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মাত্র দুবার নিজ বাড়িতে এসেছিলেন। এর মধ্যে একবার এসেছিলেন মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস আগে ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর। পরে তার মৃত্যুর পর স্বজনরা শেষবারের মতো মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান সমু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের পটপরিবর্তনের পর আমাদের কাছারি ঘরে হামলা করা হয়। কাছারি ঘরটি ছিল বাবার স্মৃতিবিজড়িত। চাচা ও বাবার মৃত্যুর পর আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম। বর্তমানে সেখানে কেউ থাকে না। ঘরে তালা লাগানো রয়েছে।’
চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগরীর চশমা হিলে অবস্থিত তার বাড়িটি দীর্ঘ দুই দশক ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু হলে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তার বড় ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। গণ-অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালানো হয়। ওই ঘটনার পর থেকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের কাউকে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা যায়নি।
মঙ্গলবার দুপুরে সরজমিনে দেখা যায়, একসময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মুখর থাকা বাড়িটির সামনে এখন আর সেই চিরচেনা ভিড় নেই। অনেকটা পরিত্যক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। বর্তমানে একজন নিরাপত্তারক্ষী ও কয়েকজন কর্মচারী সেখানে অবস্থান করছেন।
রাজধানীর বনানীর এফ ব্লকে অবস্থিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গোপালগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বাড়ি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাড়িটি ছিল ক্ষমতা ও প্রভাবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। শেখ পরিবারের অন্যতম সদস্য শেখ সেলিমের বাড়িটি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো আওয়ামী লীগের একটি বলয়ের রাজনীতি। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ও পরবর্তী সময়ে একাধিক দফা হামলা ও লুটপাটের শিকার হয় বাড়িটি। বর্তমানে বাড়িটি দরজা-জানালাছাড়া ও আসবাবপত্রবিহীনভাবে পড়ে রয়েছে। এমনকি সদর দরজাটিও লুট হওয়ায় অস্থায়ীভাবে টিনের দরজা তৈরি করা হয়েছে।
একইভাবে বনানীর ১৮ নম্বর রোডে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বাসভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তিনিও শেখ পরিবারের অন্যতম সদস্য। তিন তলাবিশিষ্ট ভবনটির সামনে গিয়ে দেখা যায়, সদর দরজা বন্ধ। পার্কিং জোনে একাধিক পোড়া গাড়ি। এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ৫ আগস্টের অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুড়ে যাওয়ার স্পষ্ট ক্ষত।
বাড়িতে অবস্থানরত কেয়ারটেকার ইয়াকুব আলী (ছদ্মনাম) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাড়ির অধিকাংশ জিনিসপত্র লুট হয়ে গেছে। কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। যেগুলো ছিল সেগুলো গুছিয়ে রাখা হয়েছে। বাড়ির মালিক দেশের বাইরে থাকায় সংস্কার করা যাচ্ছে না। পরিবারের লোকজন মাঝে মাঝে এসে দেখে যান। তবে তারা থাকেন না।
সাবেক মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার পৈতৃক বাড়ি ঢাকার দোহার উপজেলার শাইনপুকুর গ্রামে অবস্থিত। তবে তার পরিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। একসময় জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এ নেতার পৈতৃক বাড়িতে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের আনাগোনা থাকলেও বর্তমানে সেখানে আগের সেই রাজনৈতিক ব্যস্ততা নেই। স্থানীয়দের মতে, তার মৃত্যুর পর বাড়িটিও একেবার নীরব হয়ে পড়েছে।
খুলনা নগরের শেরেবাংলা রোডে ‘শেখ বাড়ি’ এখন প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা ও বাগেরহাট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলালের বাবা শেখ আবু নাসেরের এ বাড়িটি একসময় দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। একাধিক দফা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর বর্তমানে সেখানে কেবল ভাঙা দেয়াল ও ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট রয়েছে।
বরিশালে এক সময়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘সেরনিয়াবাত ভবন’ এখন ধ্বংসস্তূপ। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর মালিকানাধীন এ ভবনটি ২০২৪ সালের আগস্টে অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা হামলার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারী যন্ত্র দিয়ে অবশিষ্ট কাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে সেখানে আগাছা ও ঝোপঝাড় গজিয়েছে।
গাজীপুরের ছয়দানায় সাবেক সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ‘মেয়র ভবন’ নামে পরিচিত বাড়িটিতে ৫ আগস্টের পর ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট হয়। বর্তমানে সেটিও প্রায় পরিত্যক্ত।
কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের বাড়িও দুই দফা হামলার শিকার হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকা বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত।
নাটোরে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের আলোচিত ‘জান্নাতি প্যালেস’ আজ স্থানীয়দের কাছে ‘ভূতের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের পর আর সংস্কার হয়নি। একই জেলার সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলকের বাড়িটিও বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকে। একজন কেয়ারটেকার ছাড়া সেখানে কেউ নিয়মিত বসবাস করেন না।
মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ১০ তলা ভবন প্রায় দুই বছর ধরে জনমানবহীন অবস্থায় পড়ে আছে। এক সময় যেখানে নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে থাকত, এখন সেখানে নীরবতা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাড়ি অগ্নিকাণ্ডের পর আর সংস্কার করা হয়নি। পুড়ে যাওয়া ভবনটি এখন ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
নড়াইলে সাবেক ক্রিকেটার ও সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজার বাড়িও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ভেতরে পোড়া দেয়াল, ভাঙা কাচ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত আসবাবপত্রের চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান।
রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের পর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের গ্রামের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটলেও সেখানে তার স্বজনরা বসবাস করছেন।
চাঁদপুরে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনির শহরের বাসা ও পৈতৃক বাড়ি উভয়ই হামলা ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। বর্তমানে বাড়িগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। একই জেলার সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাড়িতেও অগ্নিসংযোগের পর আর কেউ বসবাস করছেন না।
ফেনীতে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর পৈতৃক বাড়ি ও আলোচিত বাগানবাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও চলে যান।
কুমিল্লায় সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের বাসভবনও এখন প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। পোড়া দেয়াল, ভাঙা ইট-পাথর ও আগাছায় ঢেকে গেছে এক সময়ের ব্যস্ত বাড়িটি।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর একটির উত্তরসূরি। চারবারের সংসদ সদস্য প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ছেলে। মঙ্গলবার নগরীর সার্সন রোডে অবস্থিত তার বাসভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, একসময় রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে মুখর বাড়িটিতে এখন তেমন কারো আনাগোনা নেই। পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে নীরবতা।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে বাড়িটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন একজন নিরাপত্তারক্ষী ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের পরিবারের কাউকে বাড়িটিতে আসতে দেখা যায়নি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক তথ্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ একসময় চট্টগ্রাম ও জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ ছিলেন। তবে নগরীর আন্দরকিল্লার দেওয়ানজি পুকুরপাড়ে অবস্থিত তার পারিবারিক বাড়িতে এখন আর আগের মতো মানুষের তেমন আনাগোনা নেই।
সরজমিনে দেখা যায়, ভবনটির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বাসিন্দারা থাকলেও হাছান মাহমুদের পরিবারের সদস্যদের পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে সেখানে তার শাশুড়ি বসবাস করছেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দেখা যায়নি।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দন ইউনিয়নের সাদেকনগর গ্রামে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বাড়িটিও এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। সাতবারের সংসদ সদস্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা এ নেতার বাড়িতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সে সময় বাড়ি ও গাড়িতে আগুনও দেয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বা তার পরিবারের কাউকে ওই বাড়িতে দেখা যায়নি।
দিনাজপুরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র সাবেক নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি দিনাজপুর-২ (বোচাগঞ্জ-বিরল) আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের টানা পাঁচবারের সাংগঠনিক সম্পাদক। আর তার বাবা আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুর রউফ চৌধুরী। ফলে দীর্ঘ সময় দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের পদচারণা ছিল তাদের বড়িটিতে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বাড়িতে কেউ না থাকলেও দীর্ঘদিন অক্ষত ছিল। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে তাদের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সাবেক নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের এসব ঘটনা নজিরবিহীন। এমন ঘটনা এখনো চলছে। পুরো বাংলাদেশ এসব ঘটনার সাক্ষী।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা