চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সচল রয়েছে বলে দাবি করেছেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রোববার সকাল থেকে শ্রমিক–কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে বন্দরের জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে কাজ চলছে না।
রোববার দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘বন্দরের কাজ সচল আছে। কেউ কাজ করতে চাইলে বাধা নেই। কেউ বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।’
তিনি আরো দাবি করেন, বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন এবং যানবাহন চলাচল করছে।
যদিও সংবাদ সম্মেলনের পর বেলা দেড়টার দিকে বন্দর চার নম্বর গেট, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও সংশ্লিষ্ট ফটক ঘুরে কোনো পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল দেখা যায়নি। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার তৎপরতাও নেই।
বন্দরসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সীমিত পরিসরে কাজ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ না দেয়ায় সে উদ্যোগ সফল হয়নি। নিউমুরিং টার্মিনালে একটি জাহাজ থেকে কয়েকটি কনটেইনার প্রাইম মুভার ট্রেইলারে নামানো হলেও তা ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক উদ্যোগের অংশ, নিয়মিত অপারেশন নয়।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা বলছেন, জেটির পাশাপাশি বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আজ থেকে কনটেইনার ও বাল্ক উভয় ধরনের পণ্য পরিবহনেই কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী অপারেটরের কাছে ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান জানান, এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষিও শেষ হয়নি।
কর্মবিরতির পটভূমিতে গত এক সপ্তাহে আন্দোলনের মাত্রা ধাপে ধাপে বেড়েছে। ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রথমে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন দিন কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও পরদিন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর প্রতিবাদে শনিবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়া হয়।
শ্রমিক কর্মচারীদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে এনসিটি বিদেশী অপারেটরের কাছে ইজারা না দেয়ার ঘোষণা, বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্দোলনের কারণে কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেয়া।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন অভিযোগ করেন, আন্দোলন দমাতে প্রশাসনিক চাপ বাড়াতে বন্দর ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আমাদের পরিষদের কয়েকজন নেতাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শ্রমিক কর্মচারীরা স্বত:স্ফূর্তভাবেই কাজে যোগ দেননি।
বন্দর ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এবং শ্রমিকদের আন্দোলন চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। দেশের আমদানি রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বন্দরের এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার কথা বলছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।