প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদারত্ব ও রোহিঙ্গা সংকট

বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, কৌশলগত অংশীদারত্ব, রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা ও জলবায়ু অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। আজ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, কৌশলগত অংশীদারত্ব, রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা ও জলবায়ু অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশ কানাডার মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের অবস্থান দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই। এ সময় কানাডার প্রতিমন্ত্রী এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন।

জ্বালানি ও কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা

বৈঠকে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে দেশটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে বলে জানানো হয়। বাংলাদেশ এ প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা জানায়।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ বাড়াতেও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা। এ খাতে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও দক্ষ নার্স তৈরিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ জানায় দেশটি। বর্তমানে এ খাতে কানাডার কার্যক্রম রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় সহযোগিতা

বাংলাদেশের সঙ্গে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় সহায়তার আগ্রহ জানায় কানাডা। এ সময় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে চলমান কার্যক্রমের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের কৃষক কার্ড কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে কৃষকদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এসব তথ্য কৃষি খাতে সঠিক পরিকল্পনা তৈরি এবং সরকারি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে কাজে লাগবে। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনায় কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা পেতে পারে বলেও আলোচনা হয়।

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগ

বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্র করা এবং নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করা গেলে দেশের অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তার সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

জলবায়ু অর্থায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প

বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। কানাডার প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার দেয়ার বিষয়ে তার দেশের আগ্রহ রয়েছে। এ অর্থায়ন থেকে বাংলাদেশের উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা।

বাংলাদেশী-কানাডীয়দের অবদান এবং প্রধানমন্ত্রীকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ

বৈঠকে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশী ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের প্রশংসা করেন রণদীপ সরাই। তাদের উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা ও ইতিবাচক মানসিকতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুজন ব্যক্তি কানাডার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও প্রধানমন্ত্রীকে জানান। বৈঠকের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কানাডার পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও