‘‌জুলাই আহত ও শহীদ পরিবারকে প্রাপ্য অনুদান দিতে দরকার ২০০ কোটি টাকা’

শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আমাদের মধ্যে একটি কোলাবরেশন হয়েছে। আমরা শহীদদের জিনিসপত্র সংগ্রহ করছি।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর। দায়িত্ব পালন করছেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার। ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুর রহমান

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন চারটি প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, যা হলো আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সীমিত আর্থিক সহায়তা, জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও লিগ্যাসি সংরক্ষণ এবং আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।

২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১০ মাসে অভীষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এ ফাউন্ডেশন কতটা সফল হতে পেরেছে বলে আপনি মনে করেন?

প্রথমত, কিছুসংখ্যক আহত জুলাই যোদ্ধা এখনো শারীরিকভাবে স্থিতিশীলতার মধ্যে আসেননি। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে এবং তারা যাতে সুচিকিৎসা পান এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বলা চলে কেউই আর বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকিতে নেই। আমরা এ মুহূর্তে তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতেও জোর দিয়েছি। কেননা আমার অভিজ্ঞতায় যুদ্ধ বা সংঘর্ষ-পরবর্তী বেসামরিক নাগরিক ও আহতরা মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগে। এরই মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে একটি কমিটি করা হয়েছে। আমাদের সীমিত সামর্থ্যে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, জুলাই ফাউন্ডেশনে রাজস্ব খাত থেকে কোনো বাজেট বরাদ্দ হয় না। সরকারি-বেসরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ অর্থ সহায়তার পরিমাণ যথেষ্ট নয়। আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের যথেষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেয়ার মতো অর্থ আমাদের নেই। এখন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার খাত থেকে ১০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একজন ব্যক্তি ৫ কোটি টাকা করে মোট ১০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। যা থেকে ৮৫২ জন শহীদের মধ্যে ৮০৬ জনের পরিবার এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির সাড়ে ছয় হাজারের অধিক আহতদের মাঝে ১১১ কোটি টাকা বিতরণ করেছি। প্রসঙ্গত, ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রাপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উৎস থেকে আরো ১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বাকি ৮ হাজার ৭০০-এর অধিক আহতকে শুধু প্রথম ধাপের টাকা দিতেই ৮৭ কোটি টাকা লাগবে। তৃতীয়ত, অনেক শহীদ ও আহত আছেন, যার ওপর পুরো পরিবার নির্ভর করত। এক্ষেত্রে সেই পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য এ অর্থবছর থেকেই ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চতুর্থত, শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ ও জুলাইয়ের ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। ধীরে ধীরে সেসবের বাস্তবায়ন আপনারা দেখতে পাবেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে শহীদদের স্মরণে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ আয়োজন কী?

জুলাইকে কেন্দ্র করে আমাদের বেশকিছু কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে সবগুলো আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি না। তবে দোয়া মাহফিল আয়োজন ও একদম প্রান্তিক পর্যায়ের শহীদদের কথা তুলে আনার চেষ্টা চলছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছি। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে জুলাইয়ের বীরত্বগাথা লোকশিল্পীদের মাধ্যমে তুলে ধরা; সব শহীদ পরিবার, আহত ও জুলাই যোদ্ধাদের প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে সম্মাননা দেয়া; প্রতীকী ম্যারাথন, বৃক্ষরোপণসহ শহীদদের স্বজনদের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা এবং শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন কি আর্থিক সংকটে ভুগছে?

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংস্থানের কাঠামোগত কোনো উৎস নেই। কেননা এটি সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। মূলত সে কারণে অর্থসংস্থানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় দেশী-বিদেশী দাতাদের ওপর। যেটুকু সহায়তা পাই তা দিয়েই আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কিন্তু আমাদের সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অন্তত ১৪ হাজার ৮৪২ জন আহত এবং ৮৫২ শহীদ পরিবার। ফলে সবার প্রাপ্য অনুদান দিতে চাইলে আমাদের প্রথমিক পর্যায়ে অন্তত ২০০ কোটি টাকা দরকার। ফলে সমাজের বিত্তশালীদের সঙ্গে আমরা সভা করে এ সংকট দূর করার চেষ্টা করব।

আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসনে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন?

সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ যে এরই মধ্যে দুটি কমার্শিয়াল প্লট আমাদের জন্য বরাদ্দের চিন্তা করা হচ্ছে। সেখানে আহতদের ট্রেনিং সেন্টার ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। একইভাবে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের চাকরি দেয়ার চেষ্টা করছি। বিজিএমইএ শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে চেয়েছে। তবে আমরা আহতদের জন্যও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও তাদের পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।

পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আর কত সময় লাগতে পারে?

পুনর্বাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। পুনর্বাসন বলতে চাকরি, বাসস্থান, শিক্ষা সহায়তা—এগুলো সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। সরকার শহীদ পরিবার এবং আহতদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা তো বলামাত্র হবে না, নির্মাণে সময় লাগবে। চাকরির জন্য মন্ত্রণালয়গুলোয় চিঠি পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা সহায়তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের একটি নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তা সম্মানের সঙ্গে মেনে চলছে।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সম্প্রতি যে সংকট দেখা দিয়েছিল, তার কারণ আসলে কী? শেষ পর্যন্ত কীভাবে এ সংকট সমাধান করলেন?

এক কথায় মূল কারণ ছিল আস্থার সংকট। নিটোর (পঙ্গু হাসপাতাল) ও চক্ষুবিজ্ঞানে থাকা রোগীদের ক্ষতটা এখনো সারেনি। আহতদের স্বপ্ন ছিল নতুন বাংলাদেশ দেখার। অভ্যুত্থানের ১১ মাস পর অনেক কিছুই তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং তাদের মধ্যে অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিল। একই সঙ্গে একজন তরুণ হিসেবে পঙ্গুত্বকে সে মেনে নিতে পারছে না। এজন্য তাদের কাউন্সেলিং দরকার। এসব কারণে তাদের মধ্যে হতাশা এবং চারপাশের মানুষের প্রতি একটি ভিন্ন ভাবমূর্তি জন্ম নিয়েছিল। অন্যদিকে হাসপাতালের স্টাফরা কর্মবিরতি পালন করে। এ সময় একজন কর্মচারী গিয়ে একজন আহত ব্যাক্তির ওপর আক্রমণ করে। পরে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়, যা সামাল দিতে সেনাবাহিনীরও বেগ পেতে হয়। পরে উভয় পক্ষের সঙ্গে বসে, তাদের কথা শুনে এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। সে সময় তুচ্ছ ঘটনার জন্য সবার চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়া অমানবিক কাজ। এ বাজে দৃষ্টান্তের ক্ষত জাতিকে অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে। যাই হোক জুলাই আহতদের যেন এতটুকু অসম্মান না হয় সেই চেষ্টাই আমরা করছি।

শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে আপনারা কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আমাদের মধ্যে একটি কোলাবরেশন হয়েছে। আমরা শহীদদের জিনিসপত্র সংগ্রহ করছি। এরই মধ্যে গণভবনে একটি জাদুঘর করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে স্মৃতিস্তম্ভ করার কাজ চলমান রয়েছে। বাজেট পেলেই এটা করা যাবে। শহীদদের কবর স্থায়ী করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া অডিও ভিজুয়ালস, গল্প, ঘটনাগুলো আর্কাইভিং করার কাজ চলছে। সব পত্রিকায় জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলোর হার্ড কপি ও সফট কপি আমরা সংগ্রহ করে ফেলেছি। আগামীতে আমাদের নিজস্ব একটা আর্কাইভ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটি নিরসনে আপনাদের উদ্যোগ কী?

আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জন শহীদের তালিকা আছে। আরো ১৮ জন শহীদ আছেন, যারা গেজেটভুক্ত হননি। সেগুলো যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে যুক্ত করা হবে। এর বাইরে আরো অসংখ্য শহীদ আছেন, যাদের তথ্য আমাদের অজানা। তাই আমাদের তালিকা প্রস্তুতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কেননা অনেকেই আছেন যারা পুলিশি ঝামেলা এড়াতে সেই সময় পারিবারিকভাবে দাফন-কাফন সম্পন্ন করেছেন।

গেজেটের বাইরে থাকা শহীদদের তালিকাভুক্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৮১ জন শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো মামলা করেনি। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। যদি তারা মামলা নাও করেন, তাহলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। অজানা শহীদদের খোঁজ পেতে আঞ্জুমানে মুফিদুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। যে যে গোরস্তানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়, সে সব জায়গায় যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যারা স্বজনদের খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগ জানাবেন ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তাদের স্বজনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। অজানা কবরগুলোয় কারা শায়িত আছেন, তা খুঁজে বের করার কাজ শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি আপনাদের দপ্তরে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনার কারণ কী? এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

এ মুহূর্তে আমাদের হাতে যে টাকা রয়েছে (আনুমানিক ৮ কোটি) তা রাজস্ব খাতের বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান থেকে প্রাপ্ত। সেই কারণে আহতদের দ্বিতীয় ধাপের অর্থ প্রদান এবং বাকিদের প্রথম ধাপের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে জটিল রোগী এবং এখনো চিকিৎসাধীন আহত যোদ্ধাদের আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি।

এরই মধ্যে সরকার জুলাই থেকে আহতদের ভাতা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা থেকে বাকি আহতরা সম্মানিত হবেন বলে আশা করছি। আহতরা যে সরকারের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আছেন—এ বিষয় তারা বুঝতে পারলেই ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শনে সবাইকে আরো বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই।

আরও