চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের ৯ অর্থবছর

ফলের সার্বিক উৎপাদন বাড়লেও কমেছে আম, কাঁঠাল ও নারকেলের

এক দশক আগে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় নারকেল উৎপাদন হয় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৭ টন।

এক দশক আগে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় নারকেল উৎপাদন হয় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৭ টন। কয়েক বছর ফলটির উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এখন উৎপাদন নিম্নমুখী। সমাপ্ত অর্থবছরে নারকেলের উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ এক দশকে উৎপাদন কমেছে ৬১ হাজার টন। একই অবস্থা জনপ্রিয় ফল হিসেবে পরিচিত আম, কাঁঠাল, কলা, তরমুজ, বাঙ্গিসহ বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদনে। চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে মোট ফলের উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪৫০ টন। অন্যদিকে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফলের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১৭ হাজার ২৪১ টন। অর্থাৎ গত নয় বছরে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৮৬ হাজার ৭৯১ টন বা ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলা নিয়ে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে গঠিত। চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ আধিদপ্তরের তথ্যমতে, সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ কৃষি অঞ্চলের প্রায় ৫৯ হাজার ৪১২ হেক্টর জমিতে ফলের উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ১৭ হাজার ২৪১ টন। যার মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ২৫ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে ফলের উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩০১ টন, কক্সবাজার জেলায় ৫ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে ৮৯ হাজার ২০২ টন, নোয়াখালী জেলায় ৯ হাজার ১৬ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭৩ টন, ফেনীতে ৪ হাজার ৬৯৯ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫২৬ টন এবং লক্ষ্মীপুর জেলায় ১৪ হাজার ৪৩৭ হেক্টর জমিতে ফলের উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬২৯ টন।

অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ কৃষি অঞ্চলে ৫৫ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে মোট ফলের উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪৫০ টন। অর্থাৎ নয় অর্থবছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে ফলের আবাদ বেড়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৭৭ টন এবং উৎপাদন বেড়েছে ৮৬ হাজার টনের বেশি। যদিও এ কৃষি অঞ্চলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ফলের আবাদ হয়েছিল রেকর্ড ৬৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। তবে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে সব থেকে বেশি ফলের উৎপাদন হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। এ সময়ে ৬০ হাজার ১৪৩ হেক্টর জমিতে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৫ টন ফল উৎপাদন হয়।

সাধারণ মানুষের কাছে ফল হিসেবে সব সময় আম, কাঁঠাল, নারকেল, কলা, তরমুজ, বাঙ্গির চাহিদা বরাবরই বেশি। তবে চাহিদাসম্পন্ন প্রতিটি ফলের উৎপাদনই চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে ক্রমে কমে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩ হাজার ৭২৫ টন। সেখানে সমাপ্ত অর্থবছরে ৬ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৮৪ হাজার ৮০৩ টন। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ১২ হাজার ৮১৩ টন আম উৎপাদন হয়েছিল।

একই অবস্থা কাঁঠালের উৎপাদনেও। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৮৯ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের উৎপাদন হয় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩১৭ টন। সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ১৯২ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ২৫২ টন। অর্থাৎ নয় বছরের ব্যবধানে আবাদ কমেছে ১৯৭ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ১৯ হাজার ৬৫ টন। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ২৮ হাজার ৫১ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে কলা উৎপাদন হয় ৮৫ হাজার ৯৬৪ টন এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪১১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৭৫ হাজার ৩৫৩ টন। যদিও শেষ কয়েক বছর ধরেই কলার উৎপাদন নিম্নমুখী।

ফল হিসেবে নারকেলের চাহিদা সবসময় বেশি, সঙ্গে বাজারে দামও বেড়েছে অনেক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮ হাজার ৪৫২ হেক্টর জমিতে নারকেল উৎপাদন হয় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৭ টন। পরবর্তী আরো দুই অর্থবছরে নারকেল উৎপাদনে ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু তারপর থেকে নারকেলের উৎপাদনে ভাটা পড়েছে এ কৃষি অঞ্চলে। টানা পাঁচ অর্থবছরে নারকেলের উৎপাদন লাখ টন ছুঁতে না পারলেও শেষ দুই অর্থবছরে আবারো এক লাখ টন ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৯৭৭ হেক্টর জমিতে নারকেল উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৫১ টন। তরমুজের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সর্বশেষ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ১২৬ টনে। বাঙ্গির উৎপাদনও কমেছে দেড় হাজার টন।

এদিকে জনপ্রিয় ফলগুলোর উৎপাদন কমলেও বেশকিছু ফলের উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬-২৭ অর্থবছরে ১২ হাজার ৪০৮ হেক্টর জমিতে সুপারি উৎপাদন হয়েছিল ৩৯ হাজার ৭৭৭ টন। সেখানে নয় বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫১৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছাড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ১২ টন। যদিও ২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৬ টন সুপারি উৎপাদন হয়েছিল।

এছাড়া মাল্টা উৎপাদন নয় বছরের ব্যবধানে ৫ হাজার ৪৪৩ টন থেকে বেড়ে ৬ হাজার ২৩ টন, পেঁপে প্রায় ৩১ হাজার টন বেড়ে ৬৩ হাজার ৪৮৮ টন, পেয়ারা পাঁচ হাজার টন বেড়ে ৩৩ হাজার টন, আনারস ১ হাজার ৩৭ টন বেড়ে ৪ হাজার ৪৪৯ টন, জামরুল ৭১০ টন বেড়ে ১ হাজার ৪৪৭ টন, নয় বছর আগে যেখানে ড্রাগন ফ্রুট উৎপাদন হতো আট টন এখন সেটার উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টন। এছাড়া অন্যান্য ফল উৎপাদন তেমন উল্লেযোগ্যভাবে বাড়েনি।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আম, নারকেল, কলা ও কাঁঠাল উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সময় প্রয়োজন হয়। যার কারণে এ ফলগুলোর উৎপাদন বছরভেদে আরো বাড়ার কথা থাকলেও সেটি হয়ে ওঠেনি। এ কৃষি অঞ্চলে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ফলের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। জেলাটিতে গত নয় বছরেই প্রায় ৭ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদের পাশাপাশি উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ২২২ টন।

তাছাড়া দেশীয় ফলের তুলনায় বিদেশী ফলের চাহিদা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের ফল এখানকার বাজারে চলে আসায় দেশীয় ফলে লাভ হচ্ছে না।

চট্টগ্রামের বোয়ালাখালীতে ২০১০ সালে প্রায় ২০ কানি জমিতে ফলের বাগান করেন জামাল উদ্দিন। পাহাড়ের পাদদেশ হওয়ায় ফল চাষাবাদের জন্য উপযোগী জমিতে আম, মাল্টা, কমলা, লেবু, বরইসহ বিভিন্ন ফলের বাগান করেন। তবে ২০২০ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে ফলের বাগান থেকে বেরিয়ে মুরগির ফার্ম করেছেন তিনি। জামাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাগানে বারি জাত ছাড়াও বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের ফলের গাছ লাগিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ কয়েক বছরে ফলন কমে আসা, দেশীয় বাগানের ফলের বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে দাম তুলনামূলক কম পাওয়া ইত্যাদি কারণে বাধ্য হয়েই ফল বাগানের পরিধি কমিয়ে দিয়েছি।’

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ফলের আবাদ বেশ ভালো। কয়েক বছর ধরে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা, বৃষ্টিপাত ধারাবাহিক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তবে এ অঞ্চলের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ফলের উৎপাদন ভালো। জেলাগুলোয় এলাকাভিত্তিক যেসব ফলের উৎপাদন ভালো হয় সেগুলোয় যাতে আরো উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়, সেই বিষয়ে কাজ করছি।’

আরও