রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ ২০২২-৩৫) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি। রাজউক সূত্র জানিয়েছে, এ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান ড্যাপ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা, সুপারিশকৃত নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন ও সংযোজন করা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ড্যাপ পর্যালোচনা করার কথা। সে হিসাবে ২০২২ সালের ড্যাপ পর্যালোচনার সময় হবে ২০২৭ সালে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রাজউকের নগর পরিকল্পনা বিভাগ ড্যাপ সংশোধনের জন্য একটি প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। রাজউক সূত্র জানিয়েছে, খসড়াটি বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা একটি ক্রমবর্ধমান নগরী। পাঁচ বছরে এ শহরে অনেক পরিবর্তন ঘটে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নগর পরিকল্পনায় নতুন চাহিদা তৈরি হয়। এসব বিবেচনায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ড্যাপ সংশোধনের নিয়ম রাখা হয়েছে। সে অনুযায়ী সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে একটি প্রকল্পের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অনুমোদন পেলেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।’
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ড্যাপ পর্যালোচনা প্রকল্পের আওতায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হবে। গেজেট প্রকাশের পর পাঁচ বছরে ড্যাপের কত শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পাশাপাশি কোন সুপারিশগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন প্রয়োজন এবং কী পদক্ষেপ নিলে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে বিষয়েও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া হবে।
সূত্র আরো জানায়, ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে ড্যাপে বেশকিছু নীতি প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু প্রণয়ন করা হয়েছে, কিছু হয়নি। এর মধ্যে কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের কথা ছিল, সেটি হয়নি। একইভাবে বেটারমেন্ট ফি বা উন্নয়ন ফি নামেও একটি নীতি প্রণয়নের কথা ছিল, সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এবার সেগুলো যুক্ত করা হবে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘আমরা ড্যাপে কৃষিজমি চিহ্নিত করেছি। কিন্তু এসব জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। বিভিন্ন কোম্পানি জমিগুলো কিনে নিচ্ছে, সেখানে আবাসন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলছে। কৃষিজমির তুলনায় আবাসন শ্রেণীর জমির মূল্য বেশি হওয়ায় কৃষিজমি ভরাট বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি ঠেকাতে ড্যাপে কৃষিজমি সুরক্ষায় একটি নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। কৃষিজমি ও জলাশয় শ্রেণীর জমি সংরক্ষণ করলে ভূমি মালিকরা বেশকিছু সুবিধা পাবেন। কী কী সুবিধা দেয়া হবে এবং কোন শর্তে তারা সেগুলো পাবেন, তা নীতিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে।’
এছাড়া ড্যাপ সংশোধনের আওতায় উন্নয়ন ফি বা বেটারমেন্ট ফি-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। কোনো এলাকায় সরকারি প্রকল্পের কারণে জমির দাম বাড়লে ভূমি মালিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। ড্যাপে এ ধরনের ক্ষেত্রে ভূমি মালিকদের উন্নয়ন ফি পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশের পর চার বছর পেরিয়ে গেলেও এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণীত হয়নি। রাজউক সূত্র জানিয়েছে, এবার ড্যাপ সংশোধনের আওতায় নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হবে।
বিদ্যমান ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর থেকেই ছোট প্লটের মালিকদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। তবে রাজউকের দাবি, রাস্তা সরু ও প্লটের আয়তন কম হওয়ায় বড় ভবন নির্মাণের সুযোগ দেয়া হয়নি। ব্লক পদ্ধতিতে অবশ্য বড় ভবন নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে। রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ড্যাপ সংশোধনের সময় ছোট প্লটের মালিকদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হবে।
তবে ড্যাপ সংশোধনে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার দাবি জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গেজেট প্রকাশের পর ড্যাপে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন হয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। আগামী পর্যালোচনাতেও যদি আবাসন ব্যবসায়ীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে প্রাণপ্রকৃতি ও জলবায়ুকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তা আরো খারাপ উদাহরণ তৈরি করবে।’