মুন্সিগঞ্জের মেঘনার খালের ওপর ২০২১ সালে সেতু নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ৪ কোটি ২৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সেতুটির দৈর্ঘ্য থাকার কথা ছিল ৩৯ মিটার কিন্তু নির্মাণ হয়েছে ৩১ মিটার। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযোগ সড়কসহ সেতুটি হস্তান্তরের কথা ছিল। শেষ সময়ে এসে নকশা জটিলতা দেখিয়ে জুন পর্যন্ত সময় বাড়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এরপর কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও কাজ করতে পারেনি বলে অভিযোগ এলজিইডি কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতুটি মূল সড়ক থেকে অন্তত ১০-১১ ফুট উঁচু। সেতুর পূর্ব পাশের উচ্চতা কাঁচা সড়ক থেকে অন্তত ১৫-১৬ ফুট ওপরে। দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতু দিয়ে ওঠানামা করতে তিনটি সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। সাঁকো বেয়ে যাতায়াত করছে চরকেওয়ার ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমসুরা ও চরঝাপটা গ্রামের মানুষ।
বাচ্চু মৃধা নামে এক ব্যক্তি জানায়, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে আসা যাওয়া করতে হচ্ছে দুটি গ্রামের বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমানোর জন্য সরকার কোটি টাকা খরচ করে সেতু বানাল। অথচ ঠিকাদার ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিল। সেতুর চেয়ে সিঁড়ি ভালো ছিল।
সাঁকো বেয়ে সেতুতে উঠতে না পেরে খালে নামেন মুন্নি বেগম নামে এক নারী। সঙ্গে ছিল তার দুই বছরের ছেলে মিনির হোসেন। খালের পূর্ব পাশে ছেলেকে মাদ্রাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। মুন্নি বেগম বলেন, ‘সেতু বানানোর আগে যখন সাঁকো দিয়ে খাল পার হতাম তখনো এমন ভোগান্তি ছিল না। সংযোগ সড়ক ছাড়া সেতু বানিয়ে আমাদের বিপদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে সেতুতে উঠতে পারি না। খাল দিয়ে নেমে যেতেও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।’
শিগগিরই নির্মাণকাজ শেষ করার কথা জানিয়েছেন এলজিইডির প্রকৌশলী মো. শফিকুল আহসান। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে সেতুর কাজ বুঝিয়ে দিতে পারছে না। আমরা তাদের কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। সবশেষ তারা ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নিয়েছিল। এর পরও সেতুটি বুঝিয়ে দিতে পারেনি। ফের যোগাযোগ করা হলে তারা এক সপ্তাহের সময় নিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী চুক্তিপত্র বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাত-আট বছর আগেও চরঝাপটা গ্রামের মানুষ মেঘনার খালটি নৌকায় করে পার হতো। এরপর এখানে সাঁকো বানানো হয়। চরঝাপটা ও দক্ষিণ চরমসুরা গ্রামের চার হাজার মানুষ প্রতিদিন সাঁকো পার হয়ে মুন্সিগঞ্জ শহরে যাতায়াত করত। পরবর্তী সময়ে সেতু নির্মাণ শুরু হওয়ায় জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে অনেকে। নির্মাণাধীন সেতুটি চরঝাপটা ও দক্ষিণ চরমসুরা গ্রামকে যুক্ত করেছে মূল সড়কের সঙ্গে। দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় হতাশ ভুক্তভোগীরা।
সেতুর পূর্ব পাশ থেকে সাঁকো বেয়ে ওঠেন ঝাপটা গ্রামের হাজী রহমান মাস্টার (৫২)। এরপর আবার সেতুর পশ্চিম পাশে দুটি ভাঙা সাঁকো বেয়ে নিচে নামেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ছে না অবহেলিত এ গ্রামের মানুষের। সেতুটি ঘিরে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছি।’
সেতুটি নির্মাণ করছিল টিএন-এএসআইয়ের একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. রফি উদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস জানান, শিগগিরই শুরু হবে নির্মাণকাজ। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
চরকেওয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করেনি। বিগত বছর বর্ষার পর সংযোগ সড়ক করে দেয়ার কথা ছিল। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সেতুটি করা হয়েছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে মানুষ সেতুর সুফল পাচ্ছে না।’