রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, মুখোশ পরা কয়েকশ ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে প্রথমে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রের পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।
মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত এ কেন্দ্রে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের চিকিৎসা, টিকাদান, অন্তঃসত্ত্বাদের চেকআপ, প্রসবোত্তর সেবা ও পরিবার-পরিকল্পনা সেবা দেয়া হতো। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এসব সেবা দেয়া হচ্ছিল। কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে টানানো হয়েছে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড। এ ঘটনায় গতকাল স্থানীয় বিএনপি নেতাসহ অজ্ঞাত ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষ।
গতকাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাড্ডার ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের একপাশের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে, খুলে সরিয়ে নেয়া হয়েছে চালার টিন এবং ভবন-সংলগ্ন গাছপালাও কেটে ফেলা হয়েছে। ছাদের বাঁশের কাঠামো ও কাঠের বিমগুলো ভেঙে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ভবনের ভেতরে মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ, ইট-সুরকির স্তূপ। এর মাঝেই পড়ে ছিল বিভিন্ন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের ভায়াল, স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত ব্রোশিউর ও কাগজপত্র।
ভাঙা আলমারি, কাঠের ফ্রেম, নথিপত্রের বাক্স ও অন্যান্য আসবাবপত্র ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে মিশে আছে।
রাড্ডা এমসিএইচের কার্যালয়ের পাশেই মার্কেট ‘ফেয়ার প্লাজা’। এ বিপণী বিতানটির নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীরের চোখের সামনেই ঘটেছে পুরো ঘটনা। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, আনুমানিক ১২টার দিকে মুখ ও কপালে কাপড় বাঁধা দুই শতাধিক লোক রাড্ডায় প্রবেশ করে। তারা দারোয়ান বা নিরাপত্তাকর্মীকে ভয়ভীতি ও মারধর করে সরিয়ে দেয়। পরে তিনটি এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে ভবনের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশের একটি গাড়ি সেখানে উপস্থিত হয়। তারা হামলাকারীদের কাগজপত্র দেখে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। এরপরই দুর্বৃত্তরা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ক্লিনিকের ভবন ভাংচুর করে ভেতরের যাবতীয় মালপত্র ও যন্ত্রপাতি লুটে নেয়। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হামলার পর রাড্ডার জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়।
এদিকে হামলার ঘটনায় গতকাল শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। মামলায় হানিফ মিয়ার নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। হানিফ মিয়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য। আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। নাসরিন আখতার অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে এ সেন্টারে যা ঘটেছে তা নিছক কোনো ডাকাতি বা হামলা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম। সন্ত্রাসীদের আক্রমণে সেন্টারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ২৫০ জনের অধিক একটি সন্ত্রাসী দল নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এ বর্বর হামলায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের সেবা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও মুখপাত্র মো. আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কার্যালয়ে একদল ব্যক্তি অনধিকার প্রবেশ করে হামলা ও ভাংচুর চালিয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও হামলাকারীদের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় একজনের নাম উল্লেখ করা হলেও তার কোনো ঠিকানা দেয়া হয়নি। এছাড়া হামলা ও ভাংচুরে জড়িত ২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্তের পাশাপাশি আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।’