এ কারণে অন্যান্য পণ্য পরিবহনে এখন অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তি পরিবহন ভাড়ার এ চাপে দাম বেড়ে গেছে নিত্যপণ্যের।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির ঈদের আগে দেশব্যাপী পশু পরিবহন একটি জনপ্রিয় বাণিজ্য। লোডিং-আনলোডিংয়ে কম সময় লাগার পাশাপাশি প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া পাওয়া যায় পশু পরিবহনে। আবার রাউন্ড ট্রিপ বা ফিরতি পথেও ভাড়া মিলছে সহজেই। এসব কারণে পশু ছাড়া এখন আর অন্য পণ্য পরিবহনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। আবার কোনো কোনো পরিবহন মালিক রাজি হলেও ভাড়া গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি। যে কারণে সম্প্রতি আলু, পেঁয়াজ, সবজি, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম অনেকটাই বেড়েছে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকার পূর্বাণী সল্ট মিলের মালিক মোহাম্মদ হাসান। সরকারের দেয়া বিনামূল্যের লবণ বিতরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম থেকে মাদারীপুরে ১১ টন লবণ সরবরাহ করছেন। স্বাভাবিক সময়ে এ দূরত্বে ট্রাক ভাড়া ১৮-২০ হাজার টাকা। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ট্রাকই পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন অপেক্ষার পর মোহাম্মদ হাসান গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুরে লবণ পাঠিয়েছেন সাড়ে ৩০ হাজারে ট্রাক ভাড়া করে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু কোরবানির পশু বাণিজ্যের কারণে সম্প্রতি দেশব্যাপী নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি আলুর দাম ১৫ টাকা বেড়ে ২৫-২৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬৫ টাকার মধ্যে। এ সময়ে খোলা লবণের প্রতি কেজির দাম বেড়েছে অন্তত ২ টাকা। এছাড়া সবজি, ডিম, মাছসহ বিভিন্ন নিত্য ও পচনশীল পণ্যের দাম পরিবহন সংকটের কারণে বেড়ে গেছে। যদিও ঈদের পর এসব পণ্যের দাম আগের মতোই স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরবে বলে আশা করছেন তারা।
চট্টগ্রামের মাদারবাড়ী এলাকার মেসার্স ওয়েল ট্রান্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুল ইসলাম ইমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে পশু পরিবহনের চাপে ট্রান্সপোর্টের ভাড়া অত্যধিক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যানবাহনগুলো পশু টানায় অন্যান্য পণ্য পরিবহন করেনি। তবে ঈদের পর থেকে ট্রাক ভাড়া ধারাবাহিকভাবে আগের অবস্থানে ফিরে যাবে বলে আশা করছি।’
চট্টগ্রামের প্রধান পরিবহন মার্কেট মাদারবাড়ী এলাকার বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে বগুড়া থেকে সর্বনিম্ন ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে ট্রাক ভাড়ায় পণ্য পরিবহন হয়। এক সপ্তাহ ধরে তা ৫০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একইভাবে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, ফরিদপুর থেকেও ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে। এসব এলাকা থেকে মূলত কৃষিজ পণ্য ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহন হয়। দূরপাল্লার পাশাপাশি স্বল্প দূরত্বের ছোট-মাঝারি পিকআপ, ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে। কিন্তু পশু পরিবহনে অধিক লাভ থাকায় ট্রাক ও পিকআপ মালিক-চালকরা এখন আর অন্য কোনো পণ্য পরিবহনে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে কেউ জরুরি প্রয়োজনে মিনি ট্রাক ভাড়া নিতে চাইলেও পাচ্ছেন না। অনেকে রাজি হলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামের ওপর।
বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন (টিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, দেশব্যাপী প্রায় এক মাস ধরে নিত্যপণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল থাকলেও কোরবানির ঈদের আগে কিছুটা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে সরু চাল, ডিম, বয়লার মুরগি, মসুর ডাল, এমএস রড, দারুচিনি, লবঙ্গ, খোলা ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজসহ একাধিক পণ্যের দাম।
ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির ঈদের অন্তত ১০ দিন আগেই অধিকাংশ ব্যবসায়ী পণ্য সংগ্রহ করেছেন। এরপরও কিছু পণ্য জরুরি প্রয়োজনে সংগ্রহ করতে চাইলে পরিবহনের বাড়তি ভাড়ার কারণে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এর ফলে সারা দেশের স্থানীয় বাজারে কিছু পণ্যের সাময়িক সরবরাহ সংকট হয়েছে। এ কারণে আড়ত থেকে বাড়তি চাহিদায় দামও বেড়ে গেছে।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে পণ্য বিক্রি হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ দেয়া যাচ্ছে না। যানবাহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে অতি প্রয়োজন না হলে অনেকেই সরবরাহ নিচ্ছে না। এ কারণে কোরবানির ঈদের আগে বিক্রিও কমে গেছে।’ তবে ঈদের পর যানবাহনের ভাড়া কমে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছেন এ ব্যবসায়ী।