জ্বালানি সংকটে ঢাকায় কমছে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা আশফাক আহমেদ প্রায় পাঁচ বছর ধরে যাতায়াতে নিজের গাড়ি (প্রাইভেট কার) ব্যবহার করছেন। তবে সপ্তাহ দুয়েক ধরে তার ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে ছেদ পড়েছে।

জ্বালানি তেল সংকটের কারণে গাড়ির বদলে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে যাতায়াত করছেন তিনি। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে আশফাক আহমেদের মতো অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন, যার প্রভাবে ঢাকায় প্রাইভেট কার এবং মোটরসাইকেলের মতো যানবাহন চলাচল কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যানবাহনের চালক ও মালিকরা বলছেন, ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আবার দীর্ঘক্ষণ লাইনে থেকেও যে তেল পাওয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই। চলতে গিয়ে তেল ফুরিয়ে গেলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে—এমন শঙ্কাতেও অনেকে গাড়ি বের করছেন না। একদিকে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেল নিতে গিয়ে শত শত গাড়ি পাম্পের সামনে অলস বসে থাকছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে ঢাকায় ৩ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি নিবন্ধিত প্রাইভেট কার রয়েছে। এ হিসাব স্বাধীনতার পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। বিআরটিএর কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রাইভেট কারের অন্তত ৩০ শতাংশ এখন আর ব্যবহার হয় না। এ হিসাবে রাজধানীতে আড়াই লাখের বেশি সচল ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে।

রাজধানীতে প্রতিদিন কী পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করা যানবাহনের সংখ্যার তথ্য থেকে। এ এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারকারী যানবাহনের ৯০ শতাংশের বেশি প্রাইভেট কার, এমন তথ্য পাওয়া গেছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানির কাছ থেকে।

সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত মার্চে গড়ে ৫৪ হাজার যানবাহন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেছে। এর আগের মাস অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ৫৮ হাজার যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেছিল। এক মাসের ব্যবধানে যানবাহন চলাচল দৈনিক গড়ে চার হাজার কমেছে।

অবশ্য মার্চে ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে ঢাকা প্রায় এক সপ্তাহ ফাঁকা ছিল। এ সময় যানবাহন চলাচলও কম হয়েছে। ঈদের ছুটির প্রভাবে ফেব্রুয়ারিতে গড় যানবাহন চলাচল কম হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে প্রতিদিন কমবেশি ৬০ হাজার যানবাহন চলে। ঈদের সময় এ সংখ্যা দিনে ৩০ হাজারের কাছাকাছি নেমে এসেছিল। তবে এ কারণে যে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে গাড়ি চলাচল কমেছে, ব্যাপারটি তেমন নয়।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‌ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের কারণে তিনদিন এক্সপ্রেসওয়েতে সীমিতসংখ্যক যানবাহন চলাচল করেছে। ‍একুশে ফেব্রুয়ারির কারণেও দুদিন গাড়ি কম চলেছে। ছুটির কারণে মার্চে যেমন গাড়ি চলাচলে প্রভাব পড়েছে, তেমনি ফেব্রুয়ারিতেও একই কারণে গাড়ি চলাচল কম ছিল।’ এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে গাড়ি চলাচল কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকটের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরু থেকেই দেশের জ্বালানির বাজারে বিরাজ করছে অস্থিরতা। এর মধ্যে ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পাম্পগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লিটার এবং মাইক্রোবাসের জন্য ২০-২৫ লিটার তেল সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। পরে ১৫ মার্চ থেকে এ সীমা তুলে দেয়া হয়। যদিও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পাম্পগুলো তেল সংগ্রহের জন্য এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

গতকাল সরজমিনে ঢাকার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়েছে। গতকাল দুপুরে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য প্রাইভেট কারের লাইন ছিল মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত। পাম্পে গাড়ির লাইন এখন সবসময় এমন দীর্ঘ থাকছে বলে জানালেন প্রাইভেট কারচালক আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘‌তেল পেতে ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। ঢাকার অনেক ফিলিং স্টেশনে তো তেলই পাওয়া যায় না।’ তেল সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহ ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারেননি বলেও এ সময় জানান তিনি।

চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মার্চের শুরু থেকেই সরকারিভাবে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি মন্ত্রীদের গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদেরও গাড়ি ক্রয় এবং ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি সামাল দেয়ার লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিরসনে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইলেকট্রিক বাস আমদানির মতো সিদ্ধান্তও রয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার। ঢাকায় মানুষের যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারলে যানজট যেমন কমবে, তেমনি জ্বালানি সাশ্রয় হবে, পরিবেশ দূষণও কম হবে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকার যানজট কমাতে হলে আমাদের অবশ্যই ব্যক্তিগত গাড়ি কমিয়ে আধুনিক ও উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’

আরও