তবে সরকারি পরিসংখ্যানে এসব দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য উঠে আসছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে কেবল ১০০ জন। যদিও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ১৭ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সড়কে মৃত্যু হয়েছে ২৭৪ জনের। আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ১৪ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সড়কে ২৮৫ জন প্রাণ হারিয়েছে।
নিয়মিতভাবে ২০২৩ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে আসছে বিআরটিএ। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোর ওপর নির্ভর করে সরকারি সংস্থাটি। জেলা কার্যালয়গুলোর তথ্য সমন্বয় করে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশ করা হয় দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটিএর কার্যালয়গুলো যানবাহন ও চালকের লাইসেন্স দেয়া, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, যানবাহনের মালিকানা বদলির মতো সাধারণ সেবাগুলোই ঠিকমতো দিতে পারে না; সেখানে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ সংস্থাটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবলের অভাবে বিআরটিএ দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যদি সত্যিকার অর্থে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চাই, তাহলে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী হতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, কতজন হতাহত হয়, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়—এগুলো না জেনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়।’
অধ্যাপক ড. সামছুল হকের মতে, দেশের পরিবহন খাতের দুর্ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এগুলো গভীর ‘সিস্টেমিক’ ব্যর্থতার প্রতিফলন। সড়কের পুরো ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক না করলে এ মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
দেশে নিয়মিত দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করে আসছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংস্থাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। বিপরীতে বিআরটিএর তথ্যের প্রধান উৎস ‘পুলিশ কেস’। তবে বিআরটিএর কাছে অনেক দুর্ঘটনার তথ্য আসে না বলে মন্তব্য করেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের জন্য বিআরটিএর সক্ষমতা খুবই সীমিত। আবার বিআরটিএর কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে উদাসীন থাকতে দেখা যায়।’ এসব কারণে সরকারিভাবে দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
সরকারিভাবে দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য উঠে আসার অভিযোগ সম্পর্কে গতকাল একাধিকবার চেষ্টা করেও বিআরটিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এবার ঈদযাত্রায় বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়। ঢাকার সদরঘাটে নৌকা থেকে লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুই লঞ্চের চাপায় প্রাণ যায় দুজনের। কুমিল্লায় রেলগেটে বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে মৃত্যু হয় ১২ জনের। দৌলতদিয়ার রাজবাড়ীতে ফেরির পন্টুন থেকে বাস নদীতে পড়ে এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকালও কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে প্রাইভেট কারের চার যাত্রী। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে আগুন লাগে চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে। যদিও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঈদযাত্রায় আলোচিত এসব ঘটনার প্রতিটির জন্যই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। যদিও এসব কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশ কোনো কাজে আসে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর একেকটি তদন্ত কমিটি হয়। কিছুদিন হইচই হয়। এ তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। আসলে এগুলো কোনো সময়ই আলোর মুখ দেখে না। যেসব সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয় সেগুলোও বাস্তবায়ন হয় না। অন্যদিকে নতুন নতুন দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিদিনই অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, যেগুলোর কারণ চিহ্নিত কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। বিগত সরকার নানাভাবে এসব ঘটনা এড়িয়ে গেছে এবং পরিবহন মালিকদের বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা দেখছি বর্তমান সরকারও মালিকদের পক্ষ নিয়ে নানাভাবে কথা বলার চেষ্টা করছে, যা মালিকদের বেপরোয়া করে তুলতে ভূমিকা রাখছে।’