তালিকাভুক্ত কোম্পানি

পরিচালন মুনাফাকেও ছাড়িয়ে গেছে সুদ পরিশোধের ব্যয়

উচ্চ সুদহারের চাপে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির পরিচালন মুনাফার বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুদ ব্যয় পরিচালন মুনাফাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ফলে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা এলেও শেষ পর্যন্ত নিট মুনাফা কমে যাচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে লোকসানও গুনতে হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগেও ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা, নীতি সুদহার বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারকে কার্যকর করা না গেলে এ চাপ আরো বাড়বে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন খাতের কোম্পানির পরিচালন আয়ের বড় অংশই ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালন মুনাফার তুলনায় সুদ ব্যয় শতভাগ থেকে শুরু করে কয়েক হাজার শতাংশ পর্যন্ত বেশি। ফলে ব্যবসা পরিচালনা থেকে আয় হলেও তার সুফল শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি ব্যয়ের জন্যও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। এর মধ্যে নীতি সুদহার বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে বিক্রি কমে যাওয়ায় সুদ ব্যয়ের চাপ আরো বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ওষুধ, প্রকৌশল, বস্ত্র এবং কাগজ ও মুদ্রণ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি।

বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন পিএলসি সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) পরিচালন মুনাফা করেছে মাত্র ২২ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে কোম্পানিটিকে সুদ বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। মার্চ শেষে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকায়।

এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে আমরা নিজস্ব উৎস থেকে অতিরিক্ত ইকুইটি এনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বর্তমানে বাজারে চাহিদা থাকলেও চলতি মূলধন সংকটে অনেক কারখানা ১০-২০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চ সুদহার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও মূলধনের অবমূল্যায়নের কারণে উদ্যোক্তারা চরম চাপে রয়েছেন। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো যদি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চলতি মূলধন ঋণ প্রদানে আরো ইতিবাচক ভূমিকা নিত, তাহলে উৎপাদনের চাকা আবার সচল হতো এবং ব্যাংকের পাওনা অর্থও সহজেই আদায় করা যেত।’

তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের তুলনায় স্বল্প ব্যয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে ভালো হতো উল্লেখ করে এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা আশা করি, বিএসইসি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। এতে কোম্পানিগুলো উচ্চসুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে, সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং এর সুফল শেষ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডাররাও পাবেন।’

ওষুধ খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ফার্মা প্রথম তিন প্রান্তিকে ৯৯ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ২১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করেছে, যা পরিচালন মুনাফার প্রায় ২২ গুণ। একইভাবে প্রকৌশল খাতের আফতাব অটোমোবাইলস ৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ২৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করেছে। ডেসকো ১২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে সুদ পরিশোধ করেছে ১২৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর নাভানা সিএনজি ৪৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ৪৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করেছে।

একই ধরনের চাপে রয়েছে আবাসন, বস্ত্র এবং কাগজ ও মুদ্রণ খাতের কোম্পানিগুলোও। দ্য পেনিনসুলা চিটাগং ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ৪ কোটি ৩৩ লাখ ও স্টাইলক্রাফট ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করেছে।

এ সময়ে পরিচালন মুনাফার বেশির ভাগ সুদ পরিশোধে ব্যয় করেছে আরো কয়েকটি কোম্পানি। এর মধ্যে জিপিএইচ ইস্পাত পরিচালন মুনাফার ৯২ দশমিক ২ শতাংশ, ফু-ওয়াং সিরামিকস ৯৯ দশমিক ৩, মুন্নু ফ্যাব্রিকস ৯৮ দশমিক ৫ ও রানার অটোমোবাইলস ৮৯ দশমিক ৭ শতাংশ সুদ ব্যয় মেটাতে খরচ করেছে।

চার বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক ভোগব্যয় কমেছে। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবির ভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানোর কারণে ব্যাংক ঋণের সুদহারও বেড়ে গেছে। ২০২২ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করে, যা এখনো বহাল রয়েছে। এর প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে এত কঠোর মুদ্রানীতির পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। গত জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ সুদহার এখন শুধু কোম্পানিগুলোর মুনাফাই নয়, বিনিয়োগ সক্ষমতা ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকেও সংকুচিত করছে। উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে আরো কার্যকর করা না গেলে করপোরেট খাতের ওপর উচ্চ সুদের চাপ আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কোম্পানিগুলো এখনো মূলত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এতে উচ্চসুদের কারণে তারা ঋণের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত উৎস হওয়া উচিত পুঁজিবাজার। কিন্তু অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণের পথেই হাঁটছে।’

বিএসইসি আইপিওসহ বিভিন্ন অনুমোদনের সময়সীমা কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের যে সীমা রয়েছে, সেটিও পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এ সীমাবদ্ধতা তুলে দিলে কোম্পানিগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ঋণ ও ইকুইটির মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য গড়ে তুলতে পারবে।’

আরও