বাংলাদেশে বসে দেশের ব্যবসাই করতে পারি না

মোহাম্মদ আমিরুল হক। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসার পরিবেশ, ডিরেগুলেশন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বণিক বার্তার ‘অন্তর্দৃষ্টি’তে কথা বলেছেন তিনি

আপনি সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সরাসরি ভোটে পাওয়া এ ম্যান্ডেটকে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর নেতৃত্বে কীভাবে রূপ দিতে চান?

ব্যাপারটা হলো দায়বদ্ধতার। আমি সবসময় প্রাইভেট সেক্টরের একজন। আমার জন্ম চট্টগ্রাম বন্দরে। চার দশক কাজ করছি বন্দরের জন্য। লজিস্টিকস, শিপিংয়ের পর অন্য ইন্ডাস্ট্রিও গড়েছি। কিন্তু আমার মনটা ওখানেই পড়ে থাকে। আমার গড়ে ওঠাও সেখানে। আমি মূলত লজিস্টিকস, সাপ্লাই চেইন ও শিপিং খাতের মানুষ। লোডিং-আনলোডিং থেকে জাহাজ পরিচালনা—সবকিছুর সঙ্গেই আমার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা। এ কাজই আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। এটাই আমার প্যাশন।

আমি প্রায় ১০-১২ বছর চেম্বারের সেবা করেছি। প্রায় ১৫-২০ বছর আগে চিটাগং চেম্বার থেকে সরে গিয়েছিলাম। তারপর ব্যবসা-বাণিজ্যে সময় দিলাম। যখন দেখলাম আমার দুই ছেলে ব্যবসায় এসেছে, মেয়েরাও পড়াশোনা শেষ করেছে, তখন ভাবলাম এখন কিছু সময় বের করতে পারি। আমার একটা সুবিধা হলো যারা বর্তমানে আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা বাণিজ্য ব্যবস্থাটা পরিচালনা করেন, যারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তাদের ল্যাঙ্গুয়েজটা বুঝি। আমি জানি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী কী চান। আমি জানি বাণিজ্যমন্ত্রী কী চান। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিনি। তিনি কী চান, সেটাও জানি। কিন্তু নিচের পর্যায়ে কীভাবে কাজগুলো চলে, সেটা আমি জানি না। আমি ডিরেগুলেশন চাই। অর্থমন্ত্রী ডিরেগুলেশনের কথা বলেন। তিনি যে আন্তরিকতা নিয়ে ডিরেগুলেশনের কথা বলেন, সেই গভীর চিন্তাগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয় সেটাই প্রশ্ন।

আমি যখন ব্যবসা শুরু করেছি, তখন কমিশনার অব কাস্টমস যিনি ছিলেন, তিনি চিটাগং চেম্বারে আসতেন। সরাসরি ব্যবসায়ীদের মুখ থেকে শুনতেন সমস্যা কী। এখন চিটাগংয়ে কমিশনার কমপক্ষে পাঁচ-সাতজন। তাদের তো শোনার সময় নেই। অথচ সমস্যাটা যার তার কাছ থেকেই তো শুনতে হবে। ভিয়েতনামের ডিরেগুলেশনটা দেখেন। সেখানে একটি পৃষ্ঠায় পুরো লাইসেন্স দেয়া হয়। সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন, ব্যবসা শুরুর অনুমতি, ট্রেড লাইসেন্স, এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের নিবন্ধন, ক্ল্যাসিফিকেশনসহ ১৭টি লাইসেন্স একটি পাতাতেই দেয়া হয়। আপনি চাইলে অনলাইনে নিতে পারেন। আপনি ভিয়েতনামে বসে আমেরিকার ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যে কোম্পানি করতে পারেন। বাংলাদেশে বসেও সেটা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে বসে আমরা বাংলাদেশের ব্যবসাটাই করতে পারি না। আমি সব সময় বলি, আমরা আছি, আমাদের সন্তানরা এ ব্যবসায় থাকবে কিনা, আমি জানি না।

আপনি প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আপনার সিকম গ্রুপ, ডেল্টাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে। আপনার ব্যবসার খাতগুলো সম্পর্কে একটু বলেন। এ মুহূর্তে ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

আমি ব্যবসা শুরু করেছি হাঁটি হাঁটি পা পা করে। আমরা প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী। আমি বলি না যে ব্যবসা সবসময় ভালো হতে হবে। আবার এখানে এসে বলতে চাই না যে আমার গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকবে না বা থাকবে, এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই আমরা বাংলাদেশে ব্যবসা করি। আপনি যদি সুশাসন, ডিরেগুলেশন, এনার্জি, ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ এবং ব্যবসার ব্যয়—এ পাঁচটি বিষয় একত্র করে দেন, এ দেশের মানুষ কিন্তু বসে থাকবে না।

বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে। এখন আপনি যে সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেখানে তো ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় সব ধরনের উদ্যোক্তাই আছেন। এ দুই জায়গার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে করেন?

আমি চিটাগং চেম্বারের পাশাপাশি আরো দুটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। একটা হলো এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। আরেকটা হলো বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বাংলাদেশে যারা সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করে, যারা স্টিল ম্যানুফ্যাকচার করে, আমি যদিও স্টিলে নেই, তারা এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে রয়েছে। আপনি কভিড পার করলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ পার করলেন, তারপর ডলারের বিষয়টা এল। ডলার ডিভ্যালু নিয়ে আমার একটা কথা আছে। আসলে ডলার ডিভ্যালুর জন্য কি কোনো ব্যবসায়ী দায়ী? বাংলাদেশের যে আর্থিক ব্যবস্থা, কিংবা ব্যবস্থাপনা, কিংবা সিস্টেম, এটার জন্য কোনো ব্যবসায়ী কি দায়ী? ৮৪ টাকার ডলার যখন ১২০ টাকা হলো, সেটা কি বেসরকারি খাত তৈরি করেছে?

আমরা ডিরেগুলেশনের কথা অন্য জায়গায় বলি, এখানে বলি না। ওটা যদি ডিরেগুলেটেড করেন, তাহলে ডলারের দাম ১২০ টাকা নাও থাকতে পারে, আবার বাড়তেও পারে। কিন্তু ডলার মার্কেটটাকে কোনো না কোনোভাবে সরকার রেগুলেট করে, এটাই বাস্তবতা। তাহলে ৮৪ টাকার ডলার যে ১২০ বা ১২৩ টাকা হলো, তার জন্য জনগণ দায়ী না। ব্যবসায়ীরাও দায়ী না। তারা যে লোকসান করেছেন, তার জন্য এ ব্যবস্থাপনাই দায়ী। সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে হবে।

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের অবস্থান কী?

১৯৯৭-৯৮ সালে যখন স্টিভিডোরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা বাংলাদেশে এল, তখন তারা চট্টগ্রাম বন্দরে একটি টার্মিনাল করতে চেয়েছিল। আজকে যেখানে পতেঙ্গা টার্মিনাল, তার কাছাকাছি জায়গায়। তখন আমরা একটা জুজুর ভয় দেখালাম, এখানে যদি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়, তাহলে কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর এসএসএ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা শুরু হলো। বলা হলো এখানে বন্দর করা যাবে না। এভাবেই বেসরকারিভাবে বন্দর না হওয়ার বিষয়টা শুরু হলো।

চট্টগ্রাম বন্দর বেসরকারি খাতে না গেলে চলবে না। বন্দরকে ল্যান্ডলর্ড কনসেপ্টে চলতে হবে। অর্থাৎ বন্দর কর্তৃপক্ষ জমিদারের মতো থাকবে, কিন্তু টার্মিনাল পরিচালনা করবে বেসরকারি খাত। আপনি বেসরকারি খাতকে টার্মিনাল করতে দেবেন, যাকে খুশি তাকে দেন। প্রশ্ন হলো ট্যারিফ কী হবে? আপনি কাউকে টার্মিনাল দেয়ার আগেই যখন ট্যারিফ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলেন, তখন প্রশ্ন উঠবে। আমার মনে হয়, প্রথমেই যেটা করা দরকার, সেটা হলো চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব ট্যারিফ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা। আমাদের যেটা করা দরকার, সেটা হলো স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসা।

আমরা জিডিপির ১৬ শতাংশ খরচ করি লজিস্টিকসে। আর বিশ্বে গড়ে খরচ হয় ৮ শতাংশ। সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তাহলে এমনিতেই আপনার লজিস্টিকস অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। আপনি ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন। আপনার কি সেই দক্ষতা আছে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কী হওয়া উচিত এ অদক্ষতা দূর করার জন্য?

অদক্ষতা দূর করার জন্য আপনি তো প্রতিদিন বক্তৃতা করেন যে রেগুলেশন করছেন। কিন্তু আপনি অন্যের কথা শুনতে চান না। আপনি মনে করেন আপনিই সব জানেন। তাহলে আপনাকে কে বোঝাবে? আমি ৪০ বছর কাজ করার পরও শিপিং-লজিস্টিকসে এখনো ছাত্র। আর আপনি প্রতি তিন বছরে বা বারবার চেয়ারম্যান বদলে দিয়ে সবকিছু ঠিক করতে চাইছেন। সমস্যা আমাদের সিস্টেমে।

আপনি কতটুকু আশাবাদী যে এখন এ পরিবর্তনগুলো হবে?

আমাদের বলার পরও যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে তো আর হবে না। আমাদের আশাবাদী হতে হবে। একটা জিনিস দেখেন। আপনি এয়ারলাইনস চালাতে, হোটেল চালাতে, সোনারগাঁও হোটেলে জেনারেল ম্যানেজার কোথা থেকে আনেন? বিদেশ থেকে আনেন। আপনি তো প্যান প্যাসিফিকের নাম না দিয়ে সোনারগাঁও নামেই চালাতে পারতেন। প্যান প্যাসিফিক নাম দিলেন কেন? আপনি ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আনতে চান, ভালো। আমি সেটাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আপনাকে এটাও বলতে হবে, প্রাইভেট সেক্টরকে দিয়ে এটা চালাতে হবে। এটা আর পাবলিক সেক্টর দিয়ে চালানো যাবে না। আরেকটা জিনিস বুঝতে হবে। রেজিমেন্টেড ফোর্স দিয়ে রেজিমেন্টেড বিষয় চালানো যায়। কিন্তু পোর্ট ম্যানেজমেন্ট লাঠি দিয়ে চালানো যায় না।

বন্ড, কাস্টমস, এনবিআর, বিএসসি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সিদ্ধান্ত তো এখনো আমরা দেখি ঢাকাকেন্দ্রিক। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণে চিটাগং চেম্বারের কৌশল কী?

কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের একটি কনফারেন্সে পাকিস্তানের কমার্স মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে উনি বলছিলেন তাদের কাস্টমস এখন ইসলামাবাদে। মানে ওরা কেন্দ্রীয়ভাবে সব করে। এটা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে কারো দেখা করার প্রয়োজন না হয়। আপনি চীনে গিয়ে দেখেন। যদি কোনো কাস্টমসে কোনো ডকুমেন্ট জমা দেন, যেকোনো শহরে বসেই করতে পারবেন। চীন অনেক বেশি রেজিমেন্টেড। ভিয়েতনামও রেজিমেন্টেড একটা দেশ। ওখানে অর্থনৈতিক দুর্নীতির শাস্তি খুব কঠোর। ওরা পুরো ডকুমেন্টেশন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। কারণ আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত এক জায়গায় সব ডকুমেন্ট জমা দিতে পারবেন না, ততক্ষণ সমস্যা থেকেই যাবে। আপনার বিল অব এন্ট্রি যদি ডিজিটালি দেয়া হয়, কাস্টম হাউজ কি সেটা গ্রহণ করবে? সার্টিফিকেট অব অরিজিন এখনো স্ক্যান কপিতেই পাওয়া যায়। তারপরও আপনি তিনদিন বসে থাকেন। একটা সাধারণ স্যাম্পল ছাড়াতে এক মাসও লেগে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে ১০ হাজার কনটেইনার কেন রাখবেন? এত দক্ষ বন্দর হলে ১০ হাজার কনটেইনার নিলামের জন্য বন্দরের ভেতরে পড়ে থাকবে কেন? আপনি বে টার্মিনালের জন্য জায়গা করেছেন। কিন্তু বে টার্মিনালে কিছুই করেননি। এটা একটা স্বপ্ন হয়েই আছে। ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল, এক যুগেরও বেশি সময় চলে গেল। আগের সরকারও করতে পারেনি। এখন নতুন সরকার এসেছে, ছয় মাস হলো। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারও গেল। কিন্তু একটা ইটও সরাতে পারেননি।

এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকতে হবে। এ বাস্তবতায় চট্টগ্রামের শিল্প ও বন্দর কতটা প্রস্তুত?

একসময় চিটাগংয়ে ৭৫০টি গার্মেন্টস কারখানা ছিল। আমি যখন ব্যবসায় এসেছি, তখন চিটাগং ছিল গার্মেন্টসের সূতিকাগার। এখন অর্ধেকেরও কম সক্রিয় আছে। অনেকের নাম আছে, কিন্তু কার্যক্রম নেই। যারা খুব চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে, তারা টিকে আছে। কয়েকটি বড় গ্রুপ অন্যদের কারখানাও পরিচালনা করছে। কেন নেই? এটা কি এলডিসির জন্য? ব্যবসার উৎকর্ষ, ব্যবসা করার ব্যয়, এগুলো তো আমাদের ধরে রাখতে হবে। উৎকর্ষ আসবে কখন? আমরা মাতারবাড়ীতে টার্মিনাল করছি। ওখানেও কিন্তু ড্রেজিং লাগবে। আপনি বলতে পারেন, আমি সব বলে ফেলছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো ড্রেজিং লাগবেই। আপনি যদি সোনাদিয়াতে টার্মিনাল করতেন, সেখানে ১৫ মিটার ড্রাফট ছিল। আর মাতারবাড়ীতে হবে ১১ বা ১২ মিটার।

সেটা গভীর হবে কীভাবে?

সেটা যারা করবেন, তারাই জানেন। যারা গভীর সমুদ্রবন্দর করার কথা বলেছেন, তারাই তো পায়রা বন্দরও করেছিলেন। গভীর সমুদ্রবন্দর তো পায়রাতেও করতে চেয়েছিল। বন্দর এমন একটা বিষয়, এটা শুধু বললেই হয় না। পৃথিবীর কোথাও এভাবে ছোট ছোট বন্দর করে না। একটা বড় বন্দর করা হয়। তারপর সেখান থেকে ফিডার পোর্ট পরিচালিত হয়। আপনি যদি সোনাদিয়াতে একটা বন্দর করতেন, যেখানে ১৮ মিটার ড্রাফটে জাহাজ আসতে পারত, তাহলে হয়তো ১০ হাজার টিইইউসের জাহাজও সেখানে আসার সম্ভাবনা থাকত। এখন সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর মাতারবাড়ীতে জাহাজ আসবে। কিন্তু এখন থেকেই কি পরিকল্পনা করেছেন, সেখান থেকে কার্গো কীভাবে যাবে? কনটেইনার কীভাবে পরিবহন হবে? কে সার্ভিস দেবে? কে সার্ভিস প্রোভাইডার হবে? সিঙ্গাপুর, দুবাইতে একটি বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি অর্থনৈতিক হাব গড়ে উঠেছে। আমরাও তো সেই স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু কাজে লাগাতে পারিনি। ব্যর্থতার জায়গাটা কোথায়?

বাংলাদেশে টেক্সটাইল অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্টিলেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। সিমেন্টেও। এনার্জিতেও আমাদের সক্ষমতা আছে। অনেক জায়গায় ওভার ক্যাপাসিটিও আছে। এনার্জির ক্ষেত্রেও আপনি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। কে বেশি টাকা নিয়ে যায়, কে কাজ না করেও টাকা নেয়, এসব বিতর্ক আমাকে বলে লাভ নেই। যাদের দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আপনারা সমাধান করেন। কিন্তু এর জন্য কেন ভোক্তাকে মূল্য দিতে হবে? আজকে আমরা বেশি দাম দিচ্ছি কেন? আপনারা কি কখনো বলেছেন, যে ব্যাংকের ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ছিল, সেটা আজ ১৫ শতাংশ কেন? আমার ব্যবসা করার ব্যয় যে বেড়ে গেল, এর জন্য কি আমি দায়ী? যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা, কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?

সুস্থ শিল্পগুলোকে অসুস্থ করে দিচ্ছেন ব্যবসা করার ব্যয় বাড়িয়ে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো যেখানে ৯ শতাংশ ছিল, সেখানে এখন ১৫ শতাংশ। আপনি বলবেন, বিশ্ব অর্থনীতি, সুদের হার, নানা কিছু বেড়েছে। ইরান-আমেরিকার সমস্যা, ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার যে সমস্যা, অর্থনীতিতে ৫ লাখ কোটি টাকা নেই, এর জন্য কি আমি দায়ী? আমি কেন এর ভোগান্তি পোহাব?

বাংলাদেশের স্টিল সেক্টর, সিমেন্ট সেক্টর—কোন সেক্টরকে আপনি ভালো বলবেন? কিছুদিন আগেই তো টেক্সটাইলে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিতে হয়েছে। কারণ টেক্সটাইল সেক্টরও কষ্টে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক নীতিগত সহায়তা দিয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু যারা এখনো টিকে আছে, তাদের আগে বাঁচান। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের আগে বাঁচান। আপনার অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। বাস্তবে আপনার প্রবৃদ্ধি ৩ থেকে ৪ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি নিয়ে কীভাবে আপনি ভাববেন যে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট হবে, নতুন ফ্ল্যাট হবে, নতুন বিনিয়োগ হবে?

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দেখছেন?

অর্থনীতি সবসময় স্থানীয়ভাবেই দেখতে হবে। কিন্তু আমরা তো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ। বৈশ্বিক এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি মূল্যস্ফীতি থেকে বাঁচতে চান, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সামনে আনতে হবে। খাদ্য উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। হাঁস, মুরগি, মাছ—যারা এসব উৎপাদন করছেন, তাদের উৎসাহিত করতে হবে। অর্থাৎ কৃষিপ্রক্রিয়াকরণ।

আপনি যখন গ্রামীণ পর্যায়ে উৎপাদন বাড়াবেন, তখন উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। তখন আপনি তরুণ উদ্যোক্তা ও নারীদের অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে পারবেন। আমি অনেক বছর আগে ফিলিপাইনে গিয়েছিলাম। সেখানে দুটি প্রতিষ্ঠান আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। একটি নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, আরেকটি ক্রু ম্যানিং ইনস্টিটিউট। জাহাজের ক্রু এবং নার্স—এ দুই ক্ষেত্রেই তারা বিশ্বের সেরাদের মধ্যে। ৩৫ বছর আগে যেমন দেখেছি, এখনো তেমনই আছে। তাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আছে। আমাদের যেসব কলেজে আইবিএ, বিবিএ, এমবিএ পড়ানো হয়, সেগুলোর কিছু কি আমরা রূপান্তর করতে পারি না? বাংলাদেশের যেসব নারী বিদেশে কাজ করতে যান, তাদের নার্সিং প্রশিক্ষণ দেয়া যায় না? ছেলেদেরও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া যায় না? সৌদি আরবে যে ৪০ লাখ বাংলাদেশী কাজ করেন, তাদের মধ্যে যদি ২০ লাখ মানুষ কারিগরি দক্ষতা নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে অন্তত তিন গুণ বেশি আয় করতে পারতেন।

বিগত সরকারের সময়ে আমরা অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা দেখেছি। এখন নতুন সরকারও কিছু পরিবর্তন এনেছে, তবে উদ্যোগগুলো আছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সেখানে ইউটিলিটি সেবা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

অর্থনৈতিক অঞ্চল খুবই ভালো উদ্যোগ। চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ফ্রি ট্রেড জোনের অনুমোদন হয়েছে, এটা খুব ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমস্যাটা হলো আমরা এখনো শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারিনি। আপনি যদি একটা ডেটা সেন্টারও করতে চান, নতুন শিল্প করতে চান, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চান, সেখানেও প্রচুর স্বাদু পানি প্রয়োজন। তাই যে স্বপ্ন দেখবেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকতে হবে। স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পর সেখানে দক্ষতার সঙ্গে, নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস দিতে পেরেছেন? বিদ্যুৎ দিতে পেরেছেন? পানি দিতে পেরেছেন? মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কীভাবে পানি আনতে হয়, আমি দেখিয়ে দিতে পারব। বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো তো বেশ সক্রিয়ও আছে। আমি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পর্কে বলতে পারব, কারণ আমি ওই এলাকার মানুষ। মেঘনা থেকে কীভাবে পানি আনতে হবে, সেটা আমার জানা আছে। এখন যারা অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে কাজ করেন বা পানি আনার পরিকল্পনা করেন, তারা আমার কথা শুনবেন কিনা, সেটা তাদের বিষয়।

আগামী পাঁচ বছরে যদি আপনি চট্টগ্রামের জন্য একটি অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ পান, তাহলে সেটা কী হবে? কেন?

যদি আমার কথায় কোনো পরিবর্তন হয়, তাহলে আমি চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে দিয়ে যেতে চাই।

আরও