সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে অধীনস্থ অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়। অধিদপ্তরগুলো তাদের অগ্রাধিকারের বিষয়ে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষককে সহায়তা প্রদান, টেকসই কৃষি, কৃষকের ব্যয় কমানো, নিরাপদ খাদ্য এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করলেও বাস্তবে প্রতি বছর খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, ডাল, মসলাসহ নানা কৃষিপণ্যের বড় অংশ আমদানি করতে হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ এবং অনেক জমি হারাচ্ছে উৎপাদনক্ষমতা। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য তিনি পাচ্ছেন না; এর বিপরীতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে উচ্চমাত্রায়। সার, কীটনাশক, বীজ ও কৃষিযন্ত্রের সিংহভাগ এখনো আমদানিনির্ভর, আর কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে প্রকৃত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি—এ তিনটি লক্ষ্যই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এসব অর্জনে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানিতে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৩১ কোটি ডলারের চাল ও গম আমদানি করেছে বাংলাদেশ। যেটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এছাড়া ভোগ্যপণ্য (দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য, মসলা, ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনি) আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে ১০৮ কোটি ডলারের তেলবীজ ও ২৬২ কোটি ডলারের সার আমদানি করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাল, গম, মসলা, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, তেলবীজ ও সার আমদানি ব্যয় হয়েছে ৬৫১ কোটি বা ৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। শুধু এ সময়ই নয়, বিগত এক দশকে (২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫) গম ও চাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার। এর মধ্যে চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৭ হাজার ৪০১ কোটি এবং গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন চাল ও গম আমদানি করতে হয়। তেলের ৯০ শতাংশ এবং ডালের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আমদানি করা হয়। পেঁয়াজ-রসুনের মতো মসলাজাতীয় পণ্যও আমদানি করতে হয়। শুধু আলুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ফলে নতুন সরকারের জন্য বিপুল পরিমাণ এ আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে তেলবীজ আমদানি করা হয়েছে ৮৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। আর ভোজ্যতেল আমদানি ব্যয় ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। পাশাপাশি গত ১০ বছরে ৫৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের ডালজাতীয় পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এছাড়া এ সময়ে ৮২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকার চিনি আমদানি হয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ খাদ্যমূল্যস্ফীতি। এটাকে মোকাবেলা করতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেজন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার। কৃষি কার্ডের কথা হচ্ছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু কার্ড করলেই হবে না, ব্যবহার করতে হবে। কৃষককে নগদ সহায়তা দিতে হবে। এখানে বিনিয়োগ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কৃষি খাতের অবনতি হয়েছে। গত ৫৪ বছর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশের ওপরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে গেছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশে। উৎপাদন কমায় অভ্যন্তরীণ সরবরাহ কমছে। ফলে খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে একটি আমদানি বিকল্প নীতি কৃষিতে গ্রহণ করতে হবে।’ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘শুধু চাল না, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বনজ সম্পদ বিশেষ করে ফলমূল সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সাম্প্রতিককালে যেই খাদ্যমূল্যস্ফীতি এত বেশি হয়েছে তার প্রধান কারণ হলো আমাদের খাদ্যের উৎপাদন কম এবং সরবরাহ কম। আমাদের খাদ্যমূল্যস্মৃতি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। গত চার বছর ধরে এটি উচ্চ। বিশ্বব্যাংকের খাদ্য সূচি অনুযায়ী চার বছর ধরে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার দিক দিয়ে লাল তালিকাভুক্ত আছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে শস্য বহির্ভূত কৃষি খাত তথা মাছ, মাংস, ডিম, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও বনজ সম্পদের উৎপাদনও বাড়াতে হবে।’
কৃষির অন্যতম ভিত্তি উপাদান বীজ। তবে এখানে বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। পাটের বীজ ৭০ শতাংশের ওপর, ভুট্টা প্রায় ৯০ শতাংশ, সবজি ৬০ শতাংশ, হাইব্রিড ধান ২০ শতাংশ, তেলবীজ ও মসলার বীজের ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ ইউরিয়া সার দেশে উৎপাদন হয়। বাকি সব সার আমদানি করতে হয়। কীটনাশকেরও ৯০ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়। আমদানিনির্ভরতার কারণে কৃষির ব্যয় বাড়ছে। যেটি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত মৌসুমে সবজির দামে ভুগতে হয়েছে ভোক্তাকে। অন্যদিকে সারা বছর হাহাকার ছিল আলুচাষীদের। কৃষককে রক্ষায় হিমাগার গেটে ২২ টাকা কেজি আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সেই আলু ৮ থেকে ১৫ টাকার বেশি দাম কৃষক পাননি। অথচ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, উৎপাদন থেকে শুরু করে হিমাগার ভাড়া পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুতে কৃষকের খরচ হয় ১৮ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের কৃষকদের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত পণ্য ধান। তবে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে কৃষকরা ধান উৎপাদনে যে খরচ করেন অন্যান্য ফসলের তুলনায় এখানে মুনাফা কম পান। বোরো ধানের ক্ষেত্রে অনেক সময় কৃষকের ব্যয় উঠেও আসে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষির জন্য ইনপুট সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এ সরকারের বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এখন বোরো মৌসুম চলছে সার, কীটনাশক, পানি, বিদ্যুৎ এগুলো যেন তারা নির্বিঘ্নে পান সে নিশ্চয়তা দিতে হবে। কৃষকের জন্য ভর্তুকি বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষণায় এসেছে বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের মুনাফা ঋণাত্মক। সেজন্য কৃষক যেন চাষ ছেড়ে না দেন সেজন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘কৃষক দাম পান না, কিন্তু বাজারে দাম বেশি। এখানে মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। এ চক্র ভাঙতে হবে। কৃষকের পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া এবং তাদেরকে নগদ অর্থসহায়তা দেয়া যায় কিনা, সেটি বিবেচনায় নেয়া উচিত।’
মাঠপর্যায়ের কৃষকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। নতুন সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা অগ্রাধিকার বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে কাজ করছি। মাটির গুণাগুণ রক্ষা করে কীভাবে পরিমিত রাসায়নিকের ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ানো যায়, কৃষকের ব্যয় কমানো, ডালসহ যেসব পণ্য আমদানির প্রয়োজন হয়, সেগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে পেঁয়াজসহ যেসব পণ্যের বীজ দেশীয়ভাবে উৎপাদন হয়, সেগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি না করার সক্ষমতা অর্জনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যদিও তিনি বলেছেন, অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আরো অনুসন্ধানে তাদের একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে।’
দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক জলাশয় হ্রাস, মানসম্মত পোনার ঘাটতি। পশুখাদ্যের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য, রোগব্যাধির বিস্তার, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাবের মতো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এছাড়া নদী-সমুদ্রের মাছ, ব্রয়লারের মাংসে ভারী ধাতুর উপস্থিতিও মিলেছে। এতে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে আলোচনা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আবু সুফিয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নিজেদের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছি। এ ১৮০ দিনের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে গবাদিপশু, প্রাণী ও পাখির ১৮ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে। আমরা উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নিরাপদ খাদ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সেজন্য প্রান্তিক পর্যায়ে খামারিদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইন করার মতো বিভিন্ন বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছি।’ অন্যদিকে মৎস্য অধিদপ্তর মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনী ইশতাহার অনুযায়ী অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেসব অনুমোদন দিলে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কৃষক কার্ডের বিষয়টি রয়েছে। এটি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কৃষিসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকার খাতগুলো চিহ্নিত ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।’