শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা নিয়ে গঠিত খুলনা-৩ আসন। সিটি করপোরেশনের ১-১৫ নম্বর ওয়ার্ড, যোগীপোল ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন এ আসনের মধ্যেই। বিসিক শিল্পনগরীও সংসদীয় এলাকায় পড়েছে। ষাটের দশকে দেশের শিল্পায়িত এলাকাগুলোর একটি ছিল খুলনা। তবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক অধ্যুষিত এ জনপদ এখন বিষণ্ন। বেকারত্ব আর মানসিক অশান্তিতে দুর্বিষহ জীবন কাটছে অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের। অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মোহম্মদ মাহফুজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুল আউয়াল, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাসদের জনার্দন দত্ত ও জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শেখ আরমান হোসেন। এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মাঠে রয়েছেন এসএম আরিফুর রহমান মিঠু, মঈন মোহাম্মদ মায়াজ, মো. আবুল হাসনাত সিদ্দিক ও মো. মুরাদ খান লিটন।
ভোটাররা বলছেন, ষাটের দশকে ভৈরব ও রূপসা নদীর কোলঘেঁষে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপিত হতে থাকে। তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ খুলনায় যেতে শুরু করে কাজের খোঁজে। খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী এলাকায় তখন শ্রমিকদের আধিপত্য ছিল। সেই অবস্থা এখন অনেকটাই ম্লান হয়েছে। যিনি খুলনার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং বন্ধ মিল-কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারবেন, তাকেই ভোট দেবেন তারা।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন—তিন দলেরই আলাদা ভোট ব্যাংক রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শ্রমিক ভোট, আঞ্চলিকতা এবং আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হতে পারে এ আসনের জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর।
ফুলবাড়ি গেট এলাকার এক বাসিন্দা জানান, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। ঘরে কেউ অসুস্থ হলে দৌড়াতে হয় দূরের মেডিকেল কলেজে। যানজট ঠেলে সেখানে যেতেই রোগীর প্রাণ যাওয়ার দশা হয়। বন্ধ কারখানা চালু ও শিল্পাঞ্চলে বড় হাসপাতাল নির্মাণের নিশ্চয়তা চান তারা।
একসময় খালিশপুর প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন আবুল বাশার। তিনি বলেন, ‘একসময়ের কর্মচঞ্চল খালিশপুর এখন প্রায় বিরান ভূমি। হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার চলে গেছেন। যারা আছেন, কেউ রিকশা-ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার ও চিকিৎসা সংকটে নাভিশ্বাস উঠেছে।’
একই জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘পাটকল বন্ধের পর আমার স্বামী রিকশা চালান। সেই আয়ে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে সংসার চলছে। আমরা কাজ চাই। যিনি মিলগুলো চালুর বাস্তব নিশ্চয়তা দেবেন, আমরা সেই ব্যক্তিকেই ভোট দেব।’
শ্রমিক অধ্যুষিত এ আসনে অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী পালাক্রমে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালের পর এ আসনে জামায়াত কখনো প্রার্থী দেয়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসনটিতে ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৬ ও নারী ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৫ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন আটজন।
বিএনপির প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘খুলনা শিল্পাঞ্চলকে এখন আর শিল্পাঞ্চল বলা চলে না। বিগত সরকার লুটপট করে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়। তারা শ্রমিকদের কোনো দাবি পূরণ করেনি। নির্বাচিত হলে বন্ধ কলকারখানা চালুসহ মৃতপ্রায় শিল্পনগরীকে আধুনিক শিল্পনগরী হিসেবে গড়ে তুলব।’
জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে শ্রমিকদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচিত হলে বন্ধ পাটকলগুলোর শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করব।’
ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘বিগত দিনে সবাই শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। নির্বাচিত হলে বন্ধ পাটকল চালুসহ শ্রমিকদের জন্য কাজ করব।’