স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৯৭০ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা করে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল। ১৯৯৭ সালে ১০০ শয্যা এবং ২০২২ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল খুব একটা বাড়েনি। ৫৬টি চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন ৩০ জন। নার্সসহ অন্যান্য পদেও রয়েছে লোকবল সংকট। শুধু জনবল সংকট নয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ সংকটও রয়েছে হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রোগীদের।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সার্জারি, চক্ষু ও অ্যানেসথেশিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০টি পদের মধ্যে আটটিতে চিকিৎসক নেই। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া সম্ভব হয় না বলেও স্বীকার করেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। রোগীরা বলছেন, কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে তাদের যেতে হচ্ছে খুলনা ও রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার চিকিৎসা কেন্দ্রে।
সরজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার, চিকিৎসকের কক্ষ, ওষুধ সরবরাহ কেন্দ্র সবখানেই রোগীর উপচে পড়া ভিড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
ভর্তি রোগীদের অভিযোগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হয়। কনসালট্যান্ট চক্ষু, অ্যানেসথেশিয়া, সার্জারি, কার্ডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে চিকিৎসক নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অর্ধেকের কম চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। অথচ জেলার প্রধান এ হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৯০০ থেকে ১ হাজার রোগী চিকিৎসা নেয়। ২৫০ শয্যার বিপরীতে ৩০০-৩৫০ জন ভর্তি থাকে নিয়মিত। বিপুলসংখ্যক এ রোগীর জন্য ৫৬টি চিকিৎসকের পদ বরাদ্দ থাকলেও ৩০টি রয়েছে শূন্য। এছাড়া নার্সের ৯৮টি পদের মধ্যে ২৮টি শূন্য এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৭৭টি পদের মধ্যে ৪৪টি শূন্য। শুধু জনবল সংকট নয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ সংকটও রয়েছে হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে রোগীরা যাচ্ছেন খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। এতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। এছাড়া হাসপাতালে সিরাম ইলেকট্রোলাইট, থাইরয়েডের পরীক্ষা, ইকো, সিটিস্ক্যান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা না থাকায় রোগীদের প্রতিদিন যেতে হয় বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ফাতেমার বোন। তিনি বলেন, ‘ওষুধ তো দূরে থাক, একটা ক্যানোলা পর্যন্ত কিনতে হয়। আমরা গরিব মানুষ। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। মানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও নেই।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজন সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালের টয়লেটগুলোও এত নোংরা যে ব্যবহার করা খুবই কষ্টকর। টয়লেট ব্যবহারে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে যায়।’
বাদোখালী গ্রাম থেকে আসা নান্নু বলেন, ‘পাঁচদিন আগে বাবাকে এখানে ভর্তি করেছি। এখনো সুস্থ হননি। চিকিৎসক বলছেন, সব পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, খুলনায় নিয়ে যান। তাই বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, টাকার ব্যবস্থা করতে পারলে খুলনা নিয়ে যাব।’
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সামান্য জটিলতায় রোগীদের স্থানান্তর করা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। এছাড়া এমআরআই, সিটিস্কান, ইকো, সিরাম ইলেকট্রোলাইটসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হয় তাদের।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার সাদিয়া তাসনিম মুনমুন বলেন, ‘সামান্য জনবল নিয়ে প্রতিদিন সহস্রাধিক রোগীর স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। প্রতিদিন ২৫০ শয্যার পরিবর্তে প্রায় ৩০০-৩৫০ জন রোগী ভর্তি থাকে। আমাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক সংকটের কারণে আশানুরূপ সেবা দিতে পারি না। তবে ওষুধ শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে আসতে একটু সময় লাগে। এ কারণে ওই সময় কিছু ওষুধের সংকট থাকে।’ সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানান হাসপাতালের এ আবাসিক মেডিকেল অফিসার।
সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, ‘হাসপাতালে ৫৮টি প্রথম শ্রেণীর পদের মধ্যে ৩৩টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া অন্য পদেও জনবল সংকট রয়েছে। প্যাথলজিক্যাল অনেক যন্ত্রপাতির সংকটও রয়েছে। রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর পরও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। চিকিৎসক সংকট ও জনবলের বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’