টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অবশ্য বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করায় পরশুরামে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বন্যার পানি ফুলগাজী গড়িয়ে ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলায় ঢুকতে শুরু করেছে। পূর্বাঞ্চলের এ জেলায় বন্যার মাঝেই বাড়তে শুরু করেছে তিস্তাসহ কয়েকটি নদ-নদীর পানি। গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমায় পৌঁছে নদীসংলগ্ন রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এছাড়া টানা বৃষ্টিতে ২১টি জেলায় ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
ফেনী জেলা প্রশাসন ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার থেকে জেলায় ভারি বর্ষণ শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১টি স্থান ভেঙে গেছে। পানির স্রোতে সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর, আমিরাবাদ ও চর দরবেশ ইউনিয়নে নদীর তীরবর্তী এলাকার তিনটি সড়ক ধসে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে তীরবর্তী ঘরবাড়ি।
এদিকে গতকাল সকালে ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়কের রেজুমিয়া থেকে পৌরসভা পর্যন্ত অংশে এক থেকে দুই ফুট ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। এতে ছাগলনাইয়া পৌরসভা, পাঠাননগর, রাধানগরের অন্তত ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব অঞ্চল দিয়ে পানি সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঢুকে পড়ছে। এরই মধ্যে সদর উপজেলার কাজিরবাগ, মোটবী, ছনুয়া, ফাজিলপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
ফেনী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রমান্বয়ে বৃষ্টিপাত কমছে। বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৮ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’
ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফুলগাজী উপজেলার বন্যাকবলিত গ্রামগুলোয় পানির অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। পানির চাপ কমে যাওয়ায় নতুন করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা নেই। পানি কমে গেলেই ভাঙনকবলিত স্থানগুলো মেরামত করা হবে।’
বন্যায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে সেনাবাহিনী। পরশুরাম ও ফুলগাজী সেনা ক্যাম্পগুলো ট্রাইশার্ক বোট, ওবিএম ইঞ্জিন ও লাইফ জ্যাকেট প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে সেনাবাহিনীর একটি চিকিৎসক দল সিভিল সার্জনের সঙ্গে সমন্বয় সভা করেছে। সেখানে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়।
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেনীতে বন্যাকবলিত চার উপজেলার মধ্যে পরশুরামে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। ফুলগাজীতেও কিছুটা ভালোর দিকে। তবে বন্যার পানি ছাগলনাইয়ার প্রধান সড়ক গড়িয়ে নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আশা করি, আজ থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করবে। এখন পর্যন্ত ৫০ কেন্দ্রে অন্তত সাত হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ২০ হাজারের বেশি মানুষের মাঝে খাবার সরবরাহের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন।’
ভারি বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানির সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী দুইদিন নদ-নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বাড়লে বিপৎসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, বুধবার রাত থেকে নদীর পানি অন্তত দেড় থেকে দুই ফুট বেড়েছে। গতকালও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।
পাউবো কুড়িগ্রামের নিয়ন্ত্রণকক্ষের প্রতিবেদন বলছে, গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিস্তার পানি রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে ২২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানিও বাড়ছে। তবে তা এখনো বিপৎসীমার অনেকটাই নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা কম বলে জানিয়েছে পাউবো।
পাউবো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘তিস্তার পানি বাড়ছে। পানি বিপৎসীমায় পৌঁছতে পারে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। অন্য নদ-নদীর পানি বাড়লেও বিপৎসীমায় পৌঁছার আশঙ্কা নেই।’
অন্যদিকে টানা ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতে দেশের কিছু অঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ২১টি জেলায় ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে—আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, সবজি, ফলবাগান ও পান। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা। এর মধ্যে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফেনী জেলায়। সেখানে বৃষ্টির তীব্রতা ও সেচ নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে জলাবদ্ধতা বেশি দেখা দিয়েছে।
গতকাল কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য বলছে, উপদ্রুত এলাকাগুলোয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান ও আমনের বীজতলা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৬২ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমন বীজতলা ১৪ হাজার ৩৯৩, সবজি ৯ হাজার ৬৭৩, বোনা আমন ২৯৭, পাট ১৩৫, কলা ১১৪, পেঁপে ২৯৩, পান ৩৮৭, মরিচ ১০৪ ও ২৮১ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, ‘বৃষ্টিপাত হ্রাস পাওয়ায় জলাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কমছে। জেলা পর্যায়ে মাঠকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত জমির তালিকা তৈরি ও কৃষকদের পরামর্শ দিতে কাজ শুরু করেছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন ও বীজ সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।’
এছাড়া বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে উপকূলবর্তী জেলা বাগেরহাটে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। শহরের কোথাও হাঁটুসমান আবার কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার, ভেসে গেছে চিংড়ি ঘের, পুকুর ও আমন বীজতলা।
রামপাল উপজেলার চাকশ্রী গ্রামের চিংড়িচাষী আবু হুরায়রা বলেন, ‘আমার সাত বিঘা ঘেরে চিংড়ির পোনা ছিল। হঠাৎ পানি বেড়ে গিয়ে সব ভেসে গেছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে আমনের বীজতলা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আবুল কালাম আজাদ জানান, বাগেরহাট সদরসহ উপকূলীয় তিন উপজেলায় ৯১৫টি চিংড়ি ঘের, ১৭৭টি পুকুর ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।