ক্যান্সার রোগীর চাপ বাড়লেও রমেকের একমাত্র রেডিওথেরাপি যন্ত্রটি বিকল

কেমোথেরাপির সিরিয়াল পেতে লাগছে আড়াই মাস

রেডিওথেরাপি ক্যান্সার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। ক্যান্সারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা এ থেরাপির পরামর্শ দেন। এর সাহায্যে ক্যান্সারের কোষ মেরে ফেলা হয়।

রেডিওথেরাপি ক্যান্সার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। ক্যান্সারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা এ থেরাপির পরামর্শ দেন। এর সাহায্যে ক্যান্সারের কোষ মেরে ফেলা হয়। দেখা যায় ৬০-৭০ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে কোনো না কোনো সময় রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। ক্যান্সার রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালেও রয়েছে রেডিওথেরাপি (কোবাল্ট ৬০) মেশিন। হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বাড়লেও ক্যান্সার চিকিৎসার একমাত্র আধুনিক এ মেশিনটি পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে আছে প্রায় এক দশক ধরে। কেমোথেরাপিও ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি। তবে শয্যা সংকটে সিরিয়াল পেতেই কমপক্ষে আড়াই মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের।

অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এ সমস্যা সমাধানের জন্য হাসপাতালের পরিচালক সময় নিয়েছেন। দ্রুত বিষয়টির সমাধান হবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১২ জুন রেডিওথেরাপি মেশিনটি আনা হয়। ২০১৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে মেশিনটি পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়েছে। প্রায় এক দশক ধরে মেশিন পড়ে থাকলেও চালু করা বা নতুন মেশিন আনা হয়নি। ফলে এ অঞ্চলে ক্যান্সার আক্রান্তদের ছুটতে হচ্ছে ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে। বেসরকারিভাবে শুধু বগুড়ায় রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকলেও নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন। কেমোথেরাপি চালু থাকলেও শয্যা সংকটে গাদাগাদি করে থেরাপি নিতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ক্যান্সার বিভাগে কর্মরত ডা. মো. শফিকুল ইসলাম (রিপন) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্যান্সার রোগীদের সবার রেডিওথেরাপি প্রয়োজন না হলেও অনেকের কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দুটিই প্রয়োজন হয়। এ অঞ্চলের অধিকাংশ রোগী নিম্নআয়ের। তাই সরকারিভাবে থেরাপি দিতে হলে তাদের এখন জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে যেতে হবে। বেসরকারিভাবে দিতে গেলে অনেক টাকা খরচ হবে। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে রেডিওথেরাপি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৮০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে ৩০ জনের মতো রোগীকে কেমোথেরাপি দিতে হয়। কিন্তু বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চারটি বেডে সবাইকে থেরাপি দিতে হয়। এজন্য গাদাগাদি করেই থেরাপি নিতে হচ্ছে রোগীদের। যদিও রোগীদের শুইয়ে রেখে থেরাপি দেয়ার নিয়ম। তবে জায়গা না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এখনো ক্যান্সার রোগীদের আমরা আউটডোরে চিকিৎসা দিয়ে আসছি। রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনই যদি কোনো রোগীর কেমোথেরাপি দেয়ার প্রয়োজন হয়, শুধু সিরিয়াল পেতেই কমপক্ষে আড়াই মাসের মতো সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

সরজমিনে ক্যান্সার বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, একটি বেডে একসঙ্গে পাঁচজনকে কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে। এ সময় কথা হয় নওগাঁ থেকে আসা গলব্লাডার ক্যান্সারে আক্রান্ত নাসিমা বেগমের (৬৫) পুত্রবধূ নিলুফা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার আমার শাশুড়িকে ১২টি কেমোথেরাপি দিতে বলেছেন। এরই মধ্যে দুটি দেয়া হয়েছে। রোগীদের এত চাপ যে একটি বেডে পাঁচ-সাতজনকে একসঙ্গে কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, রোগীর ভিড়ের কারণে সিরিয়াল পেতেও কমপক্ষে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। বেলা ১১টার দিকে খুব ভিড় ছিল, তখন রুমে থাকা চারটি বেডের প্রত্যেকটিতেই সাতজনের মতো রোগী ছিল।’

ক্যান্সার বিভাগে রোগীর চাপ বাড়লেও বিদ্যমান অর্গানোগ্রামে চিকিৎসক আছেন একজন মেডিকেল অফিসার ও একজন সহযোগী অধ্যাপক। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন চারজন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে বিভিন্ন বিভাগ থেকে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে চালানো হচ্ছে বিভাগটি।

লোকবল সংকটের বিষয়ে রমেকের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি সার্জারি বিভাগের দায়িত্বে রয়েছি। তা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যান্সার বিভাগেও কাজ করতে হচ্ছে। লোকবল বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কথা বলবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক।’

রমেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে ক্যান্সার বিভাগের আউটডোরে নতুন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন ২৮৫ জন। এর মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৫ জন। এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত ২৭ জন। মাথা ও ঘাড়ে ক্যান্সার হয়েছে ৬৪ জনের। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ৩১, খাদ্যনালির ক্যান্সারে আক্রান্ত ১৭, মলদ্বারে ক্যান্সার হয়েছে ২৭ জনের। কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ জন, পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত ২২, ডিম্বাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত ছয়জন এবং পোস্টেড ক্যান্সার হয়েছে একজনের।

ক্যান্সার বৃদ্ধির বিষয়ে গত পাঁচ মাসে অপারেশন হওয়া ২৬৭ রোগীর ওপর জরিপ করেছেন সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা। এর মধ্যে রেকটাম ক্যান্সারে আক্রান্ত ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত ২১ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে স্তন ক্যান্সারে, যা মোট রোগীর ৩৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

শিশুদের বুকের দুধ পান করানোর প্রবণতা কমে যাওয়া ও জন্মবিরতিকরণ পিল অতিরিক্ত সেবন স্তন ক্যান্সার আক্রান্তের হার বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ডা. আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘আগে পশ্চিমা দেশগুলোতে স্তন ক্যান্সার বেশি হতো। এখন আমাদের দেশেও বাড়ছে। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ফাস্টফুড ও তৈলাক্ত খাবার বেশি গ্রহণ, অ্যালকোহলে আসক্তি, অতিরিক্ত গ্যাসের ট্যাবলেট সেবন, প্রিজারভেটিভ দেয়া প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা, তামাক সেবন, শাক-সবজি কম খাওয়া এবং লাল মাংস বেশি খাওয়ার কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’

বিকল রেডিওথেরাপি মেশিনের বিষয়ে অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হাসপাতাল চত্বরে স্বতন্ত্র ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। না হলে দীর্ঘ সময় মেশিনটি পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

আরও