ঢাকা দক্ষিণের বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার বড় ভরসা মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। সম্প্রতি জ্বর-ঠাণ্ডার রোগী বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য হাসপাতালের মতো চাপ বেড়েছে এখানেও। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী নিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা। অতিরিক্ত রোগী সামাল দিতে গিয়ে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা, বিঘ্নিত হচ্ছে মানসম্মত সেবা।
৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য খ্যাতি রয়েছে। প্রতি বছরই ডেঙ্গু মৌসুমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা এখানে ছুটে আসেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকলেও মৌসুমি জ্বর-ঠাণ্ডার প্রকোপ বেশি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভাইরাস জ্বরসহ নানা অসুখ নিয়ে হাসপাতালটির মেডিসিন বিভাগে ভিড় করছেন রোগীরা। গতকাল বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশি। তাদের মধ্যে বেশি রোগী মেডিসিন ওয়ার্ডে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৮০ শয্যার বিপরীতে এ বিভাগে রোগী ভর্তি আছেন তিন শতাধিক। মেডিসিন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ওয়ার্ডে বেড সংখ্যা ৮০। রোগী বেশি হওয়ায় হাসপাতালের করিডোরে অপরিষ্কার মেঝেতে গাদাগাদি করে বিছানা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।
রামপুরার বাসিন্দা জুঁই আক্তার জ্বর নিয়ে গতকাল ভর্তি হয়েছেন মেডিসিন বিভাগে। হাসপাতালের করিডোরে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। জুঁই আক্তারের স্বামী মো. আশিক বলেন, ‘এখানে চিকিৎসাসেবা খুবই দুর্বল। নার্সদের ডাকলে সাড়া দেয় না। কোনো কিছু বুঝতে চাইলে ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেয় না।’ শ্বশুর গোলাপ হোসেনকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছে কাতার প্রবাসী মো. জাহিদ হোসেন। হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এসেছি বেশিক্ষণ হয়নি। কিন্তু হাসপাতালের শৌচাগার ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। একে তো শত শত মানুষের জন্য অল্প কয়েকটা শৌচাগার। যেগুলো আছে সেগুলোও ব্যবহার উপযোগী নয়।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটির ৫০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ৪৫৩টি বেড। এর মধ্যে ফিজিওথেরাপিতে ১০টি বেড, এনআইসিও ২০, সাইকিয়াট্রি ১০, অর্থোপেডিক সার্জারি ২০, হেপাটোলজি ১০, এন্ডোক্রাইনোলজি ৫, জেনারেল অপথালমোলজি ১০, নাক, কান ও গলা ১০, ডেন্টিস্ট্রি ৫, নেফ্রোলজি ৪০, শিশু ৫৯, শিশু সার্জারি ৫, জেনারেল সার্জারি ৬০, রেসপিরেটরি মেডিসিন ১০, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ১০, ইউরোলজি ১০, মেডিসিন ৫৯, কার্ডিওলজি ৪০, গাইনিকোলজিতে আছে ৬০টি বেড।
হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড সূত্র জানায়, এ ওয়ার্ডে বর্তমানে রোগী তিনশর বেশি। বিপরীতে সচল শৌচাগার মাত্র তিনটি। সে হিসেবে প্রতি ১০০ রোগীর বিপরীতে শৌচাগার আছে মাত্র একটি। আরো তিন-চারটি শৌচাগার রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়। নোংরা পরিবেশের মধ্যেই বাধ্য হয়ে রোগীরা শৌচাগার ব্যবহার করছেন। অনেকে গোসলখানাকেও শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। রোগী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত দুর্গন্ধ ও নোংরা শৌচাগারে ঢুকে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।
হাসপাতালের ভোগান্তির অন্য নাম লিফট—এমন অভিযোগ জানিয়েছেন আঁখি আক্তার নামে এক রোগীর স্বজন। তিনি বলেন, ‘মাত্র দুটি লিফট সচল। রোগীর জন্য আলাদা কোনো লিফট নেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে উঠতে হয়। আমার বাবা স্ট্রোকের রোগী। অনেক অনুরোধ করেছি কেউ লিফটে ওঠার সুযোগ দেয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর লিফট পেয়েছি। হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট দুর্বলতার কারণে রোগীরা ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন।’
সার্বিক বিষয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দ্বিগুণ রোগী নিয়ে হাসপাতাল চালাতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে কোনো রোগী সেবা না পেয়ে ফিরে গেছে এমনটা আমাদের এখানে ঘটে না। আমাদের রোগী বাড়লেও ডাক্তার ও নার্স সংখ্যা বাড়ছে না। এদিক-সেদিক করে আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’