জামালপুরের সাতটি উপজেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে পাঁচটি। ২ হাজার ৩২ বর্গকিলোমিটারের এ জেলায় মোট ভোটার ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৭ ও নারী ভোটার ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮১ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২০ জন। আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই এসব আসনে আধিপত্য দেখিয়েছে। দল দুটির প্রার্থী সমানে সমানে জয়ী হয়েছে। যদিও ভোটের ব্যবধান ছিল অল্প। তবে এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক নারী ভোটার আগের সমীকরণ বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নারী ভোটাররা বলছেন, নতুন সরকারের প্রত্যাশা থাকবে নারী ও শিশুবান্ধব রাষ্ট্র গড়ে তোলার। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।
দেওয়ানগঞ্জ ও বকশিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-১ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৫ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ১৪ হাজার ১০৪ জন পুরুষ ও ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৯ জন নারী। দীর্ঘদিন এ আসন আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এবারের নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ নাজমুল হক সাঈদী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় পার্টির একেএম ফজলুল হক ও গণঅধিকার পরিষদের মো. রফিকুল ইসলাম।
ভোটাররা বলছেন, এ আসনে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি। তাদের ভোট এখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে।
নতুন সরকারের কাছে নারীদের প্রত্যাশার বিষয়ে কথা হয় মোছা. কহিনূর বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচন অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এবার মনে হচ্ছে ভোট দিতে পারব। সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে যাব। দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে এবং আমরা যেন সুন্দর ও সচ্ছলভাবে চলতে পারি, নতুন সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা।’
ইসলামপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-২ আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজার ১৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪২ হাজার ৮০৭ জন। নারী ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৩৫ জন। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির সুলতান মাহমুদ বাবু, জামায়াতের মো. ছামিউল হক ফারুকী, ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ সিরাজী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অর্ণব ওয়ারেস খান। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সুলতান মাহমুদ ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারো জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। জামায়াত প্রার্থী মো. ছামিউল হক ফারুকীও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা নিয়ে জামালপুর-৩ আসন। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন ও নারী ২ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৯ জন। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামায়াতের মো. মজিবুর রহমান আজাদী, জাতীয় পার্টির মীর সামসুল আলম লিপটন, গণসংহতি আন্দোলনের ফিদেল নঈম, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ দৌলতুজ্জামান আনছারী, গণঅধিকার পরিষদের লিটন মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারজানা ফরিদ, সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ ও শিবলুল বারী রাজু।
সরিষাবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৯৫ জন ও নারী ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬০ জন। এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির মো. ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মো. মাহবুব জামান জুয়েল, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আলী আকবর, গণঅধিকার পরিষদের মো. ইকবাল হোসেন ও নাগরিক ঐক্যের মো. কবির হাসান।
ভোটারা জানান, এ আসনেও পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি। এবারের নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণে নারীর ভূমিকা বেশিই থাকবে।
নারী উদ্যোক্তা অনামিকা সাইয়েদ বলেন, ‘আমরা যেন কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারি। ভোট যেন সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়। আগামী সরকারের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, নারীদের কাজের ক্ষেত্র সহজ করতে হবে এবং নিরাপত্তার বিষয়ে সব সময় সুদৃষ্টি রাখতে হবে।’
জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত জামালপুর-৫ আসনটি। সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৭২ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭৮ হাজার ২১৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৯৪ হাজার ৪১৪ জন। এ আসনেও পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি।
এবারের নির্বাচনে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, জামায়াতের মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ ইউনুছ আহাম্মদ, সিপিবির শেখ মো. আক্কাস আলী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের আবু সায়েম মোহাম্মদ সা-আদাত-উল করীম, জাতীয় পার্টির (জেপি) মো. বাবর আলী খান, জেএসডির মো. আমির উদ্দিন, গণঅধিকার পরিষদের জাকির হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাসুদ ইব্রাহিম ও হোসনে আরা।
আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলার কয়েকটি আসনে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি, যা জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জেলার পাঁচটি আসনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন নারীরা। এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নারী ভোটারই মুখ্য নিয়ামক হতে পারেন বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) জামালপুর জেলার সভাপতি শামীমা খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে আমি চাই, নীতিমালা মেনে নির্বাচন হোক। নির্বাচন সুন্দর ও উৎফুল্লতার সঙ্গে সুষ্ঠু হোক। যে সরকারই আসুক, তাদের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, নারী ও শিশুবান্ধব সরকার যেন হয়। দেশটা যেন দুর্নীতিমুক্ত হয়। সরকারে যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে। যার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে।’