দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাগেরহাটের রামপালে সরকারি অর্থায়নে ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া আরো ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
রামপালে সৌরবিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা যায়, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি বহুমুখীকরণ ও কার্বণ নিরসনে প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি টাকা জোগান দেয়া হবে।
এতে আরো বলা হয়েছে, রামপালে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে রামপালে ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিপিডিবি। তারই একাংশে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ব্লক-বি এলাকায় জমি উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ জমিতেই নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হবে। প্রকল্পের আওতায় ন্যূনতম ৬৪০ ওয়াট পিক ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। এছাড়া মোট ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-টাইড ইনভার্টার ও একটি পুলিং সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল সার্কিট ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং উপকেন্দ্রে দুটি ২৩০ কেভি বে নির্মাণ করা হবে।
এ বিষয়ে একনেক সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, ‘রামপালে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মধ্যে একটি বর্তমানে চালু রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের সিদ্ধান্ত আগেই বাতিল করা হয়েছে। ওই ইউনিটের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বিপিডিবি এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে মাটি ভরাট করেছে। ফলে সেখানে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রামপালের প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে স্টোরেজ ব্যবস্থা যুক্ত করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।’
একনেক সভায় যে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে তার মধ্যে নতুন প্রকল্প ১০টি ও সংশোধিত প্রকল্প দুটি এবং মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প একটি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮ ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প, রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, রংপুর সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন প্রকল্প, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নং জোনের রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ প্রকল্প, সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃজন প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়) প্রকল্প, বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্প, রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প (বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ), ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয়কৃত চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করার জন্য সংস্কার ও আধুনিকায়ন, ভজনপুর (নিজবাড়ী)-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় (জেড-৫০৬০) সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ প্রকল্প, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প, রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।