চট্টগ্রামে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজের মধ্যেই খামারিদের ভোগাচ্ছে ক্ষুরা রোগ

চট্টগ্রামে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসতেই ক্ষুরা রোগের কারণে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা।

কোরবানির ঈদের সময় ক্ষুরা রোগটির প্রকোপ বাড়লেও বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী। তবে এখনো বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় সব ধরনের গরু ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে গরুর মৃত্যু, দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যাওয়াসহ খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ রোগ প্রতিরোধে গরুর নিয়মিত টিকা, আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা ও দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ঈদুল আজহার সময় রোগটির সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছিল। ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, মিরসরাই, কর্ণফুলী, সাতকানিয়া ও হাটহাজারী উপজেলায় এ রোগের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বাছুর ও শাহিওয়াল জাতের গরু এলএসডিতে তুলনামূলক বেশি হলেও ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে সব বয়সী গরু।

পটিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘‌কোরবানির সময় গরু বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা-নেয়া করায় ক্ষুরা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। সরকারি ভ্যাকসিনের সরবরাহ কম থাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বা বিদেশী ভ্যাকসিন দিতে হয়। প্রতি ছয় মাস পরপর এ ভ্যাকসিন দিলে ভালো হয়।’

ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. আব্দুল মোমিন বলেন, ‘‌এ উপজেলায় এলএসডির পাশাপাশি গরু ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। ক্ষুরা রোগ অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস। খামারিরা গরুর চিকিৎসার জন্য আমাদের কাছে আসছেন। চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

বর্ষা মৌসুমে এ রোগের সংক্রমণ কমতে শুরু করে বলে জানান মিরসরাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার শুভ সূত্রধর।

বিশেষজ্ঞরা জানান, কোনো এলাকায় ক্ষুরা রোগ দেখা দিলে আশপাশের প্রায় শতভাগ গরু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আক্রান্ত পশুর ফোসকা ফেটে, লালা, শ্লেষ্মা, প্রস্রাব, মল ও দুধের মাধ্যমে ভাইরাস দেহ থেকে বের হয়ে আসে। সাধারণত সাত ধরনের ক্ষুরা রোগ থাকলেও বাংলাদেশে এশিয়া-১ টাইপের সংক্রমণ বেশি।

ক্ষুরা রোগ হলে গরুর শরীরে প্রথমে জ্বর হয়। তাপমাত্রা ১০৫-১০৭ ডিগ্রি পর্যন্ত থাকতে পারে। এছাড়া জিহ্বা, দাঁতের মাড়ি, মুখের ভেতর ও পায়ের ক্ষুরের মাঝে ফোসকা হয়, পরে ফোসকা ফেটে লাল ক্ষতের সৃষ্টি হয়। গাভির ওলানে ফোসকা হলে ফুলে যায় ও দুধ কমে যায়। বাছুর বা গরু মারা যাওয়ার শঙ্কা থাকে। রোগাক্রান্ত পশু সুস্থ হলেও কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায় না। দুধ ও মাংসের উৎপাদন কমে যায়।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌চট্টগ্রামে গরুর একের পর এক রোগ নানা সংকট তৈরি করছে। এখনো এলএসডি শতভাগ নির্মূল সম্ভব হয়নি। ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা কমে এলেও সংক্রমণ আছে। তবে কী পরিমাণ গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা ক্ষুরা রোগ সম্পর্কে খামারিদের সচেতন করছেন। সরকারি ভ্যাকসিনের সংকট আছে। তবে বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকল্প ভ্যাকসিন দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে। নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে খামারিদের সবসময় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’

ক্ষুরা রোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মেডিকেল ও সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রতি বছর গরুর ক্ষুরা রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। এ রোগের ভাইরাস পরিবর্তন হওয়ার কারণে অনেক সময় সব ভ্যাকসিন কাজ করে না। তাই ভাইরাস অনুযায়ী ভ্যাকসিন তৈরি জরুরি। তাছাড়া অনেকেই ভ্যাকসিন দিতে চান না। নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে। আক্রান্ত গরুকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার পাশাপাশি সুস্থ গরুকেও ভ্যাকসিন দিতে হবে।’

তিনি আরো জানান, আক্রান্ত পশুকে নরম খাবার দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা, মৃত পশুর নিরাপদ অপসারণ, খামার নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তাছাড়া আক্রান্ত গরুকে যিনি সেবা করবেন তাকেও জীবাণুনাশক ব্যবহারের পর পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। বাতাসের মাধ্যমে রোগটি ছড়াতে পারে, সে কারণে খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

আরও