নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন

তাপপ্রবাহে দেশে ২৯৩০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট, অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৫৮০ কোটি ডলার

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের তুলনায় ২০২০-এর দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের ওপর এ ক্ষতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গু, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশে বছরে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারে, যা ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল ‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: পাথওয়েজ, কস্টস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তাপপ্রবাহের কারণে। অতিরিক্ত গরমে শারীরিক পরিশ্রমের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, কমছে উৎপাদনশীলতা। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও কৃষি শ্রমিক। ফলে তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু জনস্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কৃষি উৎপাদন, শ্রমজীবী মানুষের আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে।

এ বিষয়ে কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন-সংবেদনশীল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে দেশে বছরে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। শুধু ২০২৪ সালেই অতিরিক্ত তাপের কারণে ২ হাজার ৯৩০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য উভয় ক্ষেত্রেই এ ক্ষতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের তুলনায় ২০২০-এর দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে হিট স্ট্রোকসহ তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে হৃদযন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাবের ভয়াবহতাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে ২০২৩ সালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর মডেলভিত্তিক হিসাব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে হৃদরোগ, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন অসুস্থতাজনিত মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত। অতিরিক্ত গরমের দিনে ডায়রিয়া ও তাপজনিত অবসাদের প্রকোপও বাড়তে দেখা গেছে। এছাড়া শীতের তুলনায় গ্রীষ্মকালে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মাত্রা বেশি থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তাপপ্রবাহের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে এত বড় ক্ষতি হলেও দেশে তা মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা নেই। তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ এবং প্রকাশের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে বছরে প্রায় ১০০ থেকে ৩৩০ কোটি ডলার সরাসরি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। এ হিসাবে বায়ুদূষণ ও প্রাণঘাতী নয় এমন অসুস্থতার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে।

তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ডেঙ্গুও জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দেশের সব জেলার ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য ও আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির দুই-তিন সপ্তাহ পর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। আগের চার সপ্তাহে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাড়তি চাপ তৈরি করছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর। ২০১৯-২৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে গড়ে ৪১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮২৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এতে দুর্যোগের সময় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়ে।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এমএ মুহিত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্নভাবে এবং পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার, গবেষণা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন।’ গবেষণালব্ধ প্রমাণ কাজে লাগিয়ে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বর্ধিত জলবায়ু অর্থায়নের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো দাবি তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের গরমের মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় তাপ ও স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তার সঙ্গে হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্দিষ্ট করণীয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপরও দেয়া হয়েছে গুরুত্ব।

আরও