কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন বাবা আদম মসজিদ। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল এ ঐতিহাসিক ইমারত। ১৪৮৩ সালে বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়। মুন্সিগঞ্জ সদরের দরগাহবাড়ী এলাকায় মসজিদটি অবস্থিত। এটি নির্মাণের পর দীর্ঘ ৫৪৩ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও প্রতি ওয়াক্তে মসজিদ থেকে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি।
সে ধ্বনিতে ছুটে আসেন মুসল্লিরা। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে এখানে বসে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। শত শত বছরেও একদিনের জন্যও এ মসজিদ থেকে আজান ও নামাজ বন্ধ হয়নি। এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার মুসলিম সংস্কৃতির এক অনন্য প্রাচীন নিদর্শন।
মসজিদের পাশেই রয়েছে বিখ্যাত সাধক বাবা আদমের মাজার। জনশ্রুতি রয়েছে, বাবা আদম মক্কার অদূরে তায়েফে ১০৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি ইরাকের বাগদাদে আসেন। সেখানে বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানির (রহ.) সহচার্যে তাসাউফের শিক্ষায় শিক্ষিত হন। এরপর তিনি ভারতবর্ষে আসেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে।
সেন আমলে ১১৭৮ সালে তিনি ধলেশ্বরী নদীর তীরে মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমে পৌঁছান। তখন বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জ ছিল রাজা বল্লাল সেনের রাজত্বাধীন। কথিত আছে, ওই সালেই বল্লাল সেনের সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হন বাবা আদম। মিরকাদিমের দরগাবাড়ী স্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর ৩১৯ বছর পর ১৪৮৩ সালে সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের অনুরোধে তার নামানুসারে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এর নির্মাণকাজ করেছিলেন মালিক কাফুর।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী মনোমুগ্ধকর। এর দৈর্ঘ্য ৪৩ ফুট ও প্রস্থ ৩৬ ফুট। এর দেয়ালগুলো প্রায় ৪ ফুট চওড়া। সুরকি ও লাল পোড়ামাটির ইট দিয়ে এর ভেতরের ওপরের অংশ গাঁথা। ভবনটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। সম্মুখের দিকে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশ পথ। এর দুই পাশে রয়েছে একই আকারের দুটি জানালা। মসজিদের সামনে ওপরের দিকে খোদাই করা ফরাসি ভাষায় কালো পাথরের ফলক রয়েছে।
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে চার কোনায় চারটি ত্রিভুজ আকৃতির স্তম্ভ চোখে পড়ে। এর খিলান, দরজা, স্তম্ভের পাদদেশ ও ছাদের কার্নিশের নিচে পাতলা ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার অপূর্ব নকশা করা হয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, মসজিদের ভেতরের দুটি পিলারের একটি গরম ও অন্যটি ঠাণ্ডা থাকে। ভেতরে একসঙ্গে দুই শতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।
১৯৯১ সালে ডাক বিভাগ বাবা আদম মসজিদের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক এ স্থাপনা রক্ষায় তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। পরিচর্যার অভাবে মসজিদের দেয়ালে শ্যাওলা ধরেছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একবার সংস্কার ও রঙ করেছিল। এরপর আর কোনো বড় উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
মসজিদের ইমাম মাওলানা সানাউল্লাহ বলেন, ‘বল্লাল সেনের সঙ্গে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করেন। তখন থেকেই এখানে দ্বীন প্রচারের ধারা শুরু হয়। বর্তমানে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে মসজিদের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।’ মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন হওয়ায় কমিটি চাইলেও নিজ উদ্যোগে সংস্কার করতে পারছে না।
তিনি আরো বলেন, ‘মসজিদটি স্থানীয় এলাকায় ইসলাম প্রচারে একটি কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যা আজও আছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে মানুষ আসে। এখানে নামাজ আদায় করে তারা তৃপ্তি লাভ করেন। নিয়মিত বহু দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। মসজিদের অভ্যন্তরে ও বাইরে মিলে প্রতি জুমায় ৫০০-৭০০ লোক নামাজ আদায় করতে পারেন।’
সানাউল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানে মসজিদটির ভেতরে ও বাইরে জায়গার সংকুলান হচ্ছে না মুসল্লিদের। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ, মসজিদটিতে ফাটল ধরেছে কয়েকটি স্থানে। এটি যেন সংস্কার করা হয়।’
প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি দ্রুত সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।