সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধনী বিল পাস

নিষিদ্ধই থাকছে কার্যক্রম,উত্তরণের উপায় খুঁজছে আওয়ামী লীগ

সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তা এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় সংসদ।

ফলে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রমের ওপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে নিষিদ্ধ দলটির অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন কৌশল—দলটির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে তা জানা গেছে।

তবে পরবর্তী করণীয় নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি নেতাকর্মীদের।

‘সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন বিল, ২০২৬’ গতকাল জাতীয় সংসদে পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনা হয়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। পরদিন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে গেজেট জারি করা হয়। অধ্যাদেশটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও নতুন এ বিলের মাধ্যমে অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপ দিল। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে।

বিলটির পক্ষে দেয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ বিলটা হলো একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত একটা অ্যামেন্ডমেন্ট। আগের আইনে সংশোধনের পেছনে একটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মোটামুটি একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল।’

স্পিকারও এ সময় বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী তাদের নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। পরে সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের আলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।’ এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব তুললে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত হবে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে, তাই বর্তমানে যারা সংসদে রয়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করা উচিত। কারণ আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সব বাধাবিপত্তি মোকাবেলা করে রাজনীতিতে টিকে থেকেছে। এখনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও চলবে।

এ বিষয়ে দলটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এ বিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। পাসকৃত বিলের অধীনেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যাবে, যদি বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। আমরা মনে করি দেশের আইন-শৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিবেচনায় এবং সংসদে থাকা রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্যরা নিজেদের এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইলে অবশ্যই ইউনূস সরকারের বেআইনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। আর পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর করতে চাইলে এবং ইউনূসের জিঘাংসার সংস্কৃতি ধরে রাখতে চাইলে আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে না।’

বর্তমানে পলাতক থাকা সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আহ্বান সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী আর রাজনৈতিক ক্যাডার দিয়ে স্থিতিশীলতা বেশিদিন সরকার ধরে রাখতে পারবে না। স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা খুবই প্রয়োজন। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তি সবাই দেশে স্থিতিশীলতা চায়। এর প্রতি বর্তমান সরকার সম্মান না দেখালে তারা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনবে।’

প্রায় একই কথা বলেছেন দলটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। পলাতক থাকা এ নেতা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জনগণের দল। কোনো আইন করে আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখা যাবে না। জনগণই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের বিপরীতে প্রাসঙ্গিক রাখবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং দলের শীর্ষ নেতারাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা দেশে অবস্থান করছিলেন তাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে, কেউ কেউ আটকও রয়েছেন। শীর্ষ নেতারা পালিয়ে দেশ ছাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দলটি ধীরে ধীরে আরো নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। ফলে আইন করে নিষিদ্ধের প্রয়োজন ছিল না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো উদ্যোগ আমি দেখিনি। সুতরাং একটা ঝটিকা মিছিল করা; আবার কখনো ৩২ নম্বরে গিয়ে একটু ফুল দেয়া; স্লোগান দেয়া—এভাবে তো দল হয় না, তাই না? এ দলটার আসলে শেখ হাসিনাকে ছাড়া কিছুই নেই। আর শেখ হাসিনা এ দেশে ফিরবেন বলে মনে হয় না। সুতরাং দলটা এমনিতেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেত, এটা নিষিদ্ধ না করলেও চলত।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন হয়তো নিষিদ্ধ করেছে, হয়তোবা কেউ আওয়ামী লীগ করলে যাতে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়—এ সুবিধাটা হয়তো হবে।’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। এর মধ্য দিয়ে দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। শীর্ষ নেতাদের অনুকরণে দলটির বিভিন্ন স্তরের অসংখ্য নেতাকর্মীও দেশ ছাড়েন। শেখ হাসিনার পতনের তিনদিনের মধ্যে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়। অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে রাজনৈতিক দলকেও বিচারের আওতায় আনার বিধান যুক্ত করা হয়।

অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী শক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে ২০২৫ সালের মে মাসে সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং গেজেট জারি করে। সংশোধিত আইনে ট্রাইব্যুনালকে দল নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়। ফলে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে এবং তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধন সংসদে পাস হয়ে এ নিষেধাজ্ঞার বিধান বহাল থাকে।

আরও