উপযোগী আবহাওয়া ও মাটির কারণে রংপুরেও ব্যাপক হারে পেঁয়াজ চাষ করছেন কৃষক। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে মসলাজাতীয় পণ্যটির আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ১ হাজার ৫২৫ হেক্টর বেশি। তবে ভালো মানের বীজ সংকট ও সংরক্ষণাগার না থাকায় প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছেন না উত্তরের এ অঞ্চলের চাষীরা।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সাধারণত আলু, ধান, পাট ও বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজ সরবরাহ করে। তবে পেঁয়াজ বীজ সরবরাহ করে না। স্থানীয়ভাবে কৃষকদের বীজ সংগ্রহ করতে হয়। ভালো মানের বীজ সংগ্রহে বিড়ম্বনা ও সংরক্ষণাগার না থাকায় পেঁয়াজ আবাদ বাড়লেও খুব একটা সফলতা পাচ্ছেন না তারা। জেলায় সারা বছর পেঁয়াজ আবাদ হলেও মূলত শীতে বেশি চাষাবাদ হয়। তবে গ্রীষ্মকালেও অল্প কিছু জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি উৎপাদন করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের উপযোগী। বছরে দুবার (খরিপ ও রবি) পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও মূল আবাদ হয় রবি মৌসুমে। সাধারণত সরাসরি জমিতে বীজ ছিটিয়ে অথবা অন্যত্র বীজ ছিটিয়ে ২০-৩০ দিন পর চারা তুলে এনে জমিতে রোপণ করা হয়। আবার সরাসরি পেঁয়াজ (কন্দ) বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ জমিতে বপন করা হয়। বীজ থেকে উৎপাদিত পেঁয়াজ পেতে চার-পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পেঁয়াজ আবাদের উত্তম সময়। তবে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত পেঁয়াজের আবাদ করেন কৃষকরা।
জেলায় পেঁয়াজ আবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার ২২০ টন। অপচয় ১৫ শতাংশ বাদ দিলেও বার্ষিক চাহিদার বেশি ফলন হতে পারে। গেল রবি মৌসুমে ৩ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছিল, যা থেকে উৎপাদন হয় ৫১ হাজার ৩৬ টন। আসন্ন খরিপ মৌসুমে ৩৫০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ২৬৬ হেক্টর।
জনপ্রতি ৪৫ গ্রাম হিসাব করলে জেলায় পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ৫৩ হাজার ২৫০ টন। তিন বছর আগে পেঁয়াজের ঘাটতি ছিল ১১ হাজার ৩৭৭ টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৩ হাজর ৩২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ৪২ হাজার ২৩ টন। যদিও ঘাটতি অব্যাহত ছিল গত বছর পর্যন্ত।
এ বছর অনুকূল আবহাওয়া থাকলেও ভালোমানের বীজের কারণে প্রত্যাশিত ফলন পাননি বলে জানিয়েছেন পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুবরাজপুর গ্রামের কৃষক মো. আতাউর রহমান আকাশ। তিনি বলেন, ‘পাবনা, কুষ্টিয়া ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে ভালোমানের বীজ সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। কিন্তু শতভাগ ভালো বীজ সংগ্রহ করতে পারিনি। অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন জায়গা থেকে বীজ নিয়ে এসে সেগুলোর মধ্যে নিম্নমানের বীজ মিশিয়ে বিক্রি করেন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।’
আতাউর রহমান জানান, এবার তিনি ৫০ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। এজন্য ২৬ মণ বীজ প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। প্রতি মণ বীজ কিনতে হয়েছে ৩ হাজার টাকায়। গত বছর প্রতি মণ বীজ কিনতে খরচ হয়েছিল ১১-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। পাঁচ কেজি বীজে ফলন পেয়েছিলেন গড়ে ১ মণ। প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।
গঙ্গাচড়া উপজেলার উত্তর কোলকন্দ ইউনিয়নের কৃষক আবু তালেব এ বছর ৫০ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। জয়পুরহাট থেকে ৯ কেজি বীজ সংগ্রহ করেছেন। প্রতি কেজি বীজ কিনেছেন ২ হাজার ১৫০ টাকায়। গত বছর ওই বীজ কিনেছিলেন ৩ হাজার টাকার বেশি দিয়ে কিনে একই জমি থেকে ৮০ মণ ফলন পেয়েছিলেন। খরচ তুলতে পেঁয়াজের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে লাউ আবাদ করেছেন।
জেলায় বেশির ভাগ পেঁয়াজ আবাদ হয় পীরগঞ্জে। চলতি বছর এ উপজেলায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এছাড়া গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, কাউনিয়া ও পীরগাছার চরাঞ্চলেও কম-বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়। তবে ভালোমানের বীজ না পাওয়া খরচ উঠাতে অধিকাংশ চাষী সাথী ফসল হিসেবে মরিচ, কুমড়া, লাউসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ করছেন।
পেঁয়াজ আবাদ অব্যাহত রাখতে ও ভালো মানের বীজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (অবসরপ্রাপ্ত) উদ্যান বিশেষজ্ঞ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমত ধান ও আলুর মতো পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলের বীজ কৃষকদেরই উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসি উপযোগী এলাকা চিহ্নিত করে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করলে কৃষক লাভবান হবেন। প্রয়োজনে প্রভাবশালী কৃষকদের দিয়ে প্রণোদনার মাধ্যমে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যেতে পারে। তাছাড়া কুষ্টিয়া ও নাটোরসহ দেশের প্রসিদ্ধ এলাকার বীজ নিশ্চিত করার জন্য হাতের কাছে পাইকারি বাজার সৃষ্টি করলে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।’
সার্বিক বিষয়ে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষি বিভাগ পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু তাই নয়, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য প্রণোদনার ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১২০ কৃষককে ১২০টি এয়ার ফ্লো মেশিন (বাতাস প্রবাহিত যন্ত্র) দেয়া হয়েছে। আরো ২০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা এবার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। একেকটি মেশিনের মাধ্যমে ৫০-৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন কৃষক। এতে পেঁয়াজের অপচয় কমবে এবং কৃষক লাভবান হবেন। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ভালো পাওয়ায় কৃষকও বেশি করে পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকছেন।’