পূজার ছুটিতে ভিড় বেড়েছে পর্যটন কেন্দ্রগুলোয়

সিলেটের প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই আগে থেকে রুম বুকিং দিয়ে রেখেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার টানা ছুটিতে সিলেটে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা উপলক্ষে টানা পাঁচদিনের ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। সোমবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল দিনভর রাজধানী ছেড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দীর্ঘ এ ছুটিকে কেন্দ্র করে মানুষের ভিড় বেড়েছে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে।

এদিকে যাত্রী চাহিদা বেশি থাকায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটের দুটি ট্রেনে অতিরিক্ত ছয়টি করে বগি সংযোজন করা হয়। এর ফলে সোমবার রাতের ট্রেন ২৪টি ও মঙ্গলবার সকালের ট্রেন ২১টি বগি নিয়ে ছুটে যায়। প্রতিটি ট্রেন এক হাজারেরও বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় জেলা কক্সবাজার এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে। কক্সবাজার ছাড়াও পর্যটকদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকত, হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বেড়েছে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সৈকতের নীল জলরাশি উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও এর প্রভাব পর্যটনে পড়েনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কক্সবাজারের প্রধান সমুদ্রসৈকত ছাড়াও ইনানী, হিমছড়ি, সাফারি পার্ক, মেরিন ড্রাইভ ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, পর্যটন শিল্প বিকাশের পাশাপাশি পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সাভার থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুর নুর বুলবুল বলেন, ‘টানা ছুটিতে ভ্রমণে এসে খুবই ভালো লাগছে।’ তবে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘‌হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে। ইনানীর রিসোর্টে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরও পর্যটকদের আগমনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। ’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘‌কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন মাঠে রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পর্যটকদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।’

সিলেটের প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই আগে থেকে রুম বুকিং দিয়ে রেখেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার টানা ছুটিতে সিলেটে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

সরজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকালেই অনেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সিলেটে পৌঁছে যান। জাফলং, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট, লালাখাল, মালনীছড়া চা বাগান, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণের (রহ.) মাজারসহ সিলেট নগরী ও আশপাশের স্থানগুলোতে এখন ভ্রমণপিপাসুদের মুখর উপস্থিতি। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও দর্শনার্থীদের পদচারণা বাড়ছে। সিলেট জেলার প্রায় ৫০০টি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশ কক্ষই আগাম বুকিং হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা।

নগরীর মিরের ময়দানস্থ ‘হোটেল লা রোজ’-এর ব্যবস্থাপক রবিন জানান, তার হোটেলের ৯০ শতাংশ কক্ষই আগে থেকে বুকিং হয়ে গেছে। বিশেষ করে পূজার দিনগুলোতে সিট খালি নেই। এবার ব্যবসা ভালো হবে বলে প্রত্যাশা তার।

সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, ‘যত সময় যাচ্ছে সিলেটের পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে এবং আবাসিক হোটেলগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। হোটেলগুলোতে হঠাৎ পর্যটকদের চাপ বাড়ায় কর্মচারীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।’

সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

দুর্গা পূজার ছুটিতে দর্শনার্থীদের বাড়তি বিনোদন দিতে সাগরকন্যাখ্যাত পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় আগামী শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও জেলা প্রশাসন এ আয়োজন করছে ‘বিচ-কার্নিভাল’। এ উৎসবকে ঘিরে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের বেলাভূমিতে লক্ষাধিক পর্যটক ও দর্শনার্থীর আগমনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুয়াকাটা আবাসিক হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এরই মধ্যে আবাসিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্টগুলোর ৮০-৯০ শতাংশ রুম বুকিং হয়ে গেছে। বিচ-কার্নিভাল উৎসবে পর্যটক সমাগম বৃদ্ধির লক্ষ্যে হোটেল মালিক সমিতি রুম ভাড়ার ওপর ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। কার্নিভালে স্থানীয় ও দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিচ ম্যারাথন, বিচ ফুটবলসহ নানা আয়োজন থাকছে। কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাস’র সহকারী ব্যবস্থাপক আল আমিন খান জানান, তাদের কটেজ এবং ভিলার ৮০-৯০ ভাগ কক্ষ বুকিং রয়েছে। বিচ-কার্নিভালের আগেই শতভাগ বুকিং হবে বলে আশা তার।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি এমএ মোতালেব শরীফ বলেন, ‘‌ছোট কিছু হোটেলে এখনো কক্ষ ফাঁকা রয়েছে। তবে ভালোগুলোতে কক্ষ ৯০ শতাংশের মতো বুকিং রয়েছে। যেগুলো ফাঁকা আছে সেগুলোও পূর্ণ হয়ে যাবে।’

কুয়াকাটা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসিন সাদেক বলেন, ‘লম্বা ছুটি ও বিচ-কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটা নতুনরূপে সেজেছে। থানা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে।’

ছুটিতে ভ্রমণপিপাসু অনেকের পছন্দের গন্তব্য হ্রদ-পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত রাঙ্গামাটিতেও বেড়েছে পর্যটক সমাগম। কাপ্তাই হ্রদ, সাজেক ভ্যালির পাহাড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে পর্যটকরা রাঙ্গামাটিতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন।

রাঙ্গামাটির প্রথম ইকো রিসোর্ট ‘রাইন্যা টুগুন ইকো রিসোর্ট’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ললিত সি. চাকমা বলেন, ‘রাইন্যা টুগুনের ৯৫ শতাংশ কটেজ অগ্রিম বুকিং আছে। আশা করি ফাঁকাগুলোও পর্যটকে পূর্ণ হয়ে যাবে।

রাঙ্গামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘আমাদের মোটেলে ৯০ শতাংশ রুম বুকিং আছে। ঝুলন্ত সেতুসহ বেশ কয়েকটি বিনোদন স্পট সংস্কার করা হয়েছে। পর্যটকদের বরণে আমরা প্রস্তুত।’

নদী, পাহাড় আর ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। জেলার আলুটিলা, মায়াবিনী লেক, জেলা পরিষদ পার্কসহ সব পর্যটন কেন্দ্রই পর্যটকদের উপস্থিতিতে মুখর। খাগড়াছড়ি হয়ে রাঙ্গামাটির সাজেকেও যাচ্ছেন অনেক পর্যটক। ফলে পর্যটকদের উপস্থিতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার, সিলেট, পটুয়াখালী ও রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

আরও