দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুই খাতেই যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে যেমন শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, বাজারমুখী ও সমতাভিত্তিক করতে হবে, তেমনি স্বাস্থ্য খাতেও মানোন্নয়ন, সেবার বিস্তার ও আস্থার পুনর্গঠনের দিকে নজর দিতে হবে। তারা তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এ দুই খাতেই বাস্তবধর্মী ও ফলপ্রসূ নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেন।
আজ শুক্রবার (১৬ মে) খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকার নিয়ে তারুণ্যের ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখার আলোকে দেশের তরুণ সমাজকে নীতি-প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের যৌথ উদ্যোগে সেমিনারটির আয়োজন করা হয়।
বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হলে কলেজ স্তর থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা উচিত। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী অন্য যেকোনো একটি ভাষা শিখবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন এআই টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই ভাষা শেখা সম্ভব হচ্ছে, তাই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তবে এটিকে অবশ্যই জাতীয় কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়।
তিনি আরো বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার পর যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করে, তাদের জন্য স্বল্প সুদে শিক্ষাঋণের সুযোগ থাকতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলো যেন সহজ শর্তে এ ধরনের লোন প্রদান করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের দুই বছর পর থেকে ধাপে ধাপে লোন শোধ করার সুবিধা দেয়া যেতে পারে, যাতে তারা আর্থিক চাপে না পড়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।
গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্রামের স্কুল ও কলেজে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারে না। এ সংকট নিরসনে সরকারি স্কুলগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পাঠদান কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে করে শিক্ষক সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা সমানতালে এগিয়ে যেতে পারবে।"
শিখো’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীর চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের ৮৫ মিলিয়নের বেশি তরুণ-তরুণী কীভাবে শিক্ষা পাচ্ছে তার ওপর।
তিনি বলেন, তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, স্কেলযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো দরকার। আমরা যে চার স্তরের কৌশল প্রস্তাব করেছি, তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি হতে পারে। প্রথমেই উচ্চগতির ইন্টারনেটকে সবার জন্য সাশ্রয়ী করতে হবে—এটাই এখন ডিজিটাল শিক্ষার অক্সিজেন। পরবর্তী ধাপে স্মার্ট ক্লাসরুম, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং ডেটাভিত্তিক শিক্ষক উন্নয়ন ও যুব দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য ট্যাবলেট, স্কুলে স্মার্ট ডিসপ্লে আর শিক্ষার্থীদের জন্য বাজারমুখী প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। আমরা নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে চাই না, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে রূপান্তর করতে চাই। এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সময়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তৌফিক জোয়ার্দার বলেন, মেডিকেল শিক্ষায় ন্যায্যতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে কোটা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে স্থানীয় ও গ্রামীণ মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। থাইল্যান্ডের আদলে উপজেলা ভিত্তিক কোটা চালু করে, ওই এলাকার শিক্ষার্থীকে নিকটবর্তী মেডিকেল কলেজে ভর্তি এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময় সেবা দেওয়ার শর্ত আরোপ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে নিয়োগের সময় থেকেই তিনটি আলাদা ট্র্যাক—হেলথ সার্ভিস, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ও মেডিকেল এডুকেশন—চিহ্নিত করা উচিত, যাতে দক্ষতা অনুযায়ী ক্যারিয়ার গড়ে তোলা যায়। একই সঙ্গে, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী বেড ও যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে রোগীদের সম্মানজনক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে কম খরচে কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা গড়ে তুলে মেডিকেল ট্যুরিজম ও এলডারলি কেয়ারগিভার রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এ এম জেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সায়েম মোহাম্মদ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহুলাংশে বিদেশনির্ভর হয়ে পড়েছে, কারণ রোগীরা আমাদের নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এর ফলে প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতা—উভয়ই বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করেন তিনি।
এগুলো হলো, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করতে হবে, যাতে মানুষ স্থানীয় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা ফিরিয়ে পায়।
সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিতরণ করতে হবে এবং একটি রেফারেন্স সিস্টেম চালু করতে হবে। সুস্পষ্ট স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং বেসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেখানেই নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা কাভারেজ বাড়াতে হবে এবং হেলথ কার্ড চালু করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। স্পেশালাইজড চিকিৎসা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে স্বাস্থ্য খাতে বিদেশনির্ভরতা কমবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিও অনেকটা রোধ করা যাবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদি আমিন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
তিনি বলেন, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের যারা সরাসরি বিএনপির সঙ্গে জড়িত নন, কিন্তু নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন তাদের সম্পৃক্ত করা। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষমতায়ন ও একীভূতকরণের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যতের জন্য সর্বোত্তম নীতিগুলো তৈরি করতে চাই। দেশের জন্য সেরা নীতি প্রণয়নে আমরা সেরা মানুষের মতামত শুনতে চাই, যাতে জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে আমরা প্রস্তুত থাকতে পারি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় উন্নয়নের পথনকশা হিসেবে বিএনপি মহাকাব্যিক ৩১ দফা ঘোষণা করেছে।
আসলে এটি সারসংক্ষেপ—এখন তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা ও সম্প্রসারণ হচ্ছে ।
তিনি বলেন, এই রূপরেখার আওতায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে বরাদ্দ রাখার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনীতিকদের। যদি রাজনীতিতে ভালো মানুষ আসেন, তবে জনগণও তাদের অধিকার ভোগ করতে পারবেন। যেমন ভালো রান্নার জন্য যেমন ভালো রাঁধুনি দরকার, তেমনি ভালো রাজনীতির জন্য ভালো রাজনীতিবিদ দরকার।