পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি গুদাম অপ্রতুল

সার মজুদ রাখতে বিএডিসিকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ

সার মজুদের জন্য চট্টগ্রামে সরকারি গুদাম রয়েছে আটটি। এসব গুদামে সাড়ে ১৬ হাজার টন সার রাখার সক্ষমতা থাকলেও মজুদ রাখা হচ্ছে ২৮ হাজার টন।

সার মজুদের জন্য চট্টগ্রামে সরকারি গুদাম রয়েছে আটটি। এসব গুদামে সাড়ে ১৬ হাজার টন সার রাখার সক্ষমতা থাকলেও মজুদ রাখা হচ্ছে ২৮ হাজার টন। ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি গুদাম ভেঙে ফেলা হবে, যার কারণে সার মজুদে বড় সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি গুদামে সার মজুদ রাখতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন গুদাম নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে সামনে আরো সংকট বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএডিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, সার সংরক্ষণে বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রামের পরিত্যক্ত পাটকলের গুদাম ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়া হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। গুদামে জায়গা না থাকায় সাগরে ভাসমান রয়েছে ৬০ হাজার টন টিএসপিবাহী দুটি লাইটারেজ জাহাজ। এজন্য গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কম থাকলেও গুদাম সংকটের কারণে সরকার পর্যাপ্ত মজুদ করতে পারছে না। ফলে মৌসুমে বেশি দামে সার কিনে রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে এ সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে নতুন গুদাম নির্মাণ ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন জরুরি।

বিএডিসির তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়িতে বছরে সারের চাহিদা প্রায় ৭০-৮০ হাজার টন। এসব সার সংরক্ষণে চট্টগ্রাম জেলায় গুদাম রয়েছে আটটি। এর মধ্যে নগরীর দেওয়ানহাটের পাঁচটি গুদামের ধারণক্ষমতা সাড়ে চার হাজার টন, পোর্ট কলোনি এলাকার টিজি-১ গুদামে সাড়ে চার হাজার ও টিজি-২ পোর্ট কলোনির দুটি গুদামের ধারণক্ষমতা সাড়ে সাত হাজার টন। এসব গুদাম ১৯৬১-৬২ সালের দিকে নির্মাণ করা হয়। তবে পোর্ট কলোনির টিজি-১ ও ২ গুদাম দুটি ডিসেম্বরে ভেঙে ফেলা হবে। রাঙ্গামাটিতে ৪০০ ও বান্দরবানে ২০০ টন সার ধারণক্ষমতার দুটি গুদাম থাকলেও খাগড়াছড়িতে কোনো গুদাম নেই। আর কক্সবাজারে যে গুদাম রয়েছে তার ধারণক্ষমতা দুই হাজার টন।

তবে সংকট নিরসনে চট্টগ্রামের হালিশহরের বড়পোল এলাকায় ৩ হাজার ৯০০ ও ১ হাজার ৩০০ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন দুটি গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। গুদাম দুটি মার্চে বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৪০ শতাংশ। পুরোপুরি কাজ শেষ হতে আরো এক বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বান্দরবান জেলায় একটি ৮০০ টন ধারণক্ষমতার গুদাম নির্মাণাধীন রয়েছে।

চট্টগ্রামে গুদাম সংকট মোকাবেলায় বন্ধ হয়ে যাওয়া দুটি পাটকলের গুদামে সার মজুদের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসি, বিজিসি ও বিজেএমসি কর্মকর্তাদের নিয়ে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি চট্টগ্রামে বন্ধ থাকা আমিন জুট মিলস ও সীতাকুণ্ডের এমএম জুট মিলের প্রায় ১৮টি গুদামে সার মজুদের প্রস্তাব দেয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে পাটকলগুলো পরিদর্শন করে সার মজুদের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় বিএডিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিন জুট মিলের ১২টি গুদামে প্রায় ৬০ হাজার টন এবং এমএম জুট মিলের ছয়টি গুদামে প্রায় ৩০ হাজার টন সার মজুদ রাখা সম্ভব। অব্যবহৃত এসব পাটকলের গুদাম মেরামত করে বিএডিসি লিজ নিলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সার ব্যবস্থাপনায় সংকট থাকবে না। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি।

বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আমদানীকৃত মোট নন-ইউরিয়া সারের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ আমদানি হয় চট্টগ্রাম দিয়ে। বাকি সার খালাস হয় খুলনার মোংলা বন্দরে। চট্টগ্রামে আমদানি করা সার মজুদের জন্য গুদাম না থাকায় বেসরকারি গুদামে মজুদ রাখতে হচ্ছে। এজন্য দিতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। তাছাড়া খালাস করা সার বস্তায় ভরার সময়ে অটোমেশিন ব্যবহার না করার কারণে ওজনে কম-বেশি হচ্ছে। এতে বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যদি পাটকলগুলোর গুদাম ব্যবহারের সুযোগ না হয়, তাহলে মাঝিরঘাট এলাকার পরিত্যক্ত জমিতে এক লাখ টন সার ধারণক্ষমতার ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করা গেলে সংকট কমে আসত।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (সার) মো. কামরুজ্জামান সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানীকৃত মোট সারের ৩০-৩৫ শতাংশ চট্টগ্রামে খালাস করা হয়। এখানকার সরকারি গুদামে সার মজুদের ক্ষমতা সাড়ে ১৬ হাজার টন। সেখানে অতিরিক্ত ১০-১২ হাজার টন সার মজুদ রাখা হয়। গুদামে জায়গা সংকটের কারণে আমদানিকারক শিপিং কোম্পানির গুদামগুলোতে সার রাখতে হয়। এতে বিএডিসির অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। তিনটি গুদাম ডিসেম্বরেই ভেঙে ফেলা হবে। সামনে সার সংরক্ষণে সংকট আরো বাড়বে।’

চট্টগ্রাম বিএডিসি কার্যালয়ের সার আমদানির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭২ টন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার পূর্বাঞ্চলের ২৭টি জেলায় সরবরাহ করেছে বিএডিসি। এর মধ্যে টিএসপি ২ লাখ ১৯ হাজার ৪০৭ টন, এমওপি ২ লাখ ৬২ হাজার ৫৫৬ টন এবং ডিএপি ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৬০৯ টন সার খালাস হয়েছে চট্টগ্রাম দিয়ে।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গুদামে জায়গা না থাকায় প্রায় ৬০ হাজার টন টিএসপি সার নিয়ে সাগরে ভাসছে দুটি লাইটারেজ জাহাজ। এসব জাহাজ থেকে সার খালাস না করার কারণে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ৫ টাকা করে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এছাড়া আমদানি করা এসব সার সরকার খালাস না করলে শিপিং এজেন্টগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে সার মজুদ রাখছে। এজন্য অতিরিক্ত টাকাও দিতে হচ্ছে। ছুটি শেষে সারগুলো জাহাজ থেকে খালাস করা হবে।’

বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের জানুয়ারি পরবর্তী মে মাস পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সারের চাহিদা কম থাকে। এ সময় বিশ্ববাজারে সারের দাম কমে যায়। মে মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম চড়া থাকে। সরকারি পর্যায়ে নন ইউরিয়া সারের চাহিদা বছরে প্রায় ২৪-২৫ লাখ টন।

সার্বিক বিষয়ে বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) থঅংপ্রু মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে গুদাম না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে সার সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রামে যদি এক লাখ টন ধারণক্ষমতার ওয়্যারহাউজ বা গুদাম থাকত, তাহলে ২৭টি জেলায় সারের চাহিদাপত্র পাওয়া মাত্র সরবরাহ করতে পারতাম। গুদাম সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে সময়ক্ষেপণ হয়। সেজন্য সার আমদানি ও মজুদের জন্য সরকারের বড় পরিকল্পনা প্রয়োজন। গুদামের জন্য জায়গা না পাওয়া গেলে মাঝিরঘাটের পরিত্যক্ত জায়গায় নির্মাণ করা গেলে সংকট কমবে।’

আরও