বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ

দেশে কমেছে বিদেশী পর্যটক

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তৈরি ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টের তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে আসা বিদেশী দর্শনার্থীদের প্রায় ৪৯ শতাংশই ব্যয় হয় আবাসনের পেছনে। এছাড়া খাবার ও পানীয় ১৯ শতাংশ, কেনাকাটা, অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ব্যয় ১৩ শতাংশ এবং পরিবহনে ৬ শতাংশ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, ম্যানগ্রোভ বন ও ঐতিহাসিক স্থাপনার বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পর্যটন খাতকে কাজে লাগাচ্ছে। তবে বিদেশী পর্যটক আগমনে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। গত এক দশকে পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর পরও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করা যায়নি, বরং ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর দেশে বিদেশী পর্যটক কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান বাড়াতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে বিদেশী পর্যটক এসেছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশী পর্যটক কমেছে ৪৭ হাজার ৯৪৯ জন বা ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে বিদেশী পর্যটক এসেছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন।

বাংলাদেশে কমলেও ২০২৪-এর তুলনায় ২০২৫ সালে শ্রীলংকায় পর্যটক বেড়েছে ১৫ দশমিক ১ ও মালদ্বীপে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ভুটানে। পাহাড়ঘেরা দেশটিতে ২০২৪-এর তুলনায় গত বছর ৪৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছে। ভুটান সরকারের প্রকাশিত ‘তাশেল মেলং ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে মোট ২ লাখ ৯ লাখ ৩৭৬ জন বিদেশী পর্যটক ভ্রমণ করে। এমনকি বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতে জর্জরিত পাকিস্তান ও যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানেও বাড়ছে বিদেশী পর্যটক।

বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতেও ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বিদেশী পর্যটক কমেছে। বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটক কমার অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে ভারত থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়াকে বিবেচনা করছেন। ২০২৪-এর তুলনায় ভারতে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বিদেশী পর্যটক কমেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বাংলাদেশী পর্যটকদের না যাওয়া।

ট্যুর অপারেটর গ্রুপ নো বর্ডারস ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশীয় পর্যটকরা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করলেও বিদেশী পর্যটকের আগমন কম। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার অভাব। তারা অনেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিভিন্ন স্ক্যাম হয় এমন ধারণা নিয়ে থাকে। কেউ যদি সুন্দরবন বা পাহাড়ে গিয়ে স্ক্যামের শিকার হয় তাহলে কেউ আর আসতে চাইবে না। ইকোফ্রেন্ডলি স্পট বিদেশীরা বেশি খোঁজেন। আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও দিতে পারি না। সেজন্য অনেকে খোঁজখবর নিলেও বাংলাদেশে আসতে চান না।’

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। এবারের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটন বিনির্মাণে ডিজিটাল এজেন্ডা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। দিবসটি উপলক্ষে আজ থেকে আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

দেশে বিদেশী পর্যটক বাড়াতে হলে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালাউদ্দিন সুমন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের যথাযথ ব্র্যান্ডিং করা হয়নি। দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের সুযোগও নেই। তারা বাংলাদেশে এসে অর্থ খরচ করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। এর সঙ্গে রয়েছে তুলনামূলক বেশি হোটেল ভাড়া। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিদেশী পর্যটক কোথাও গেলে তাকে ঘিরে মানুষের ভিড় তৈরি হয়। এছাড়া বিদেশীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরো সহজ করতে হবে। নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করে সুন্দরবন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থানকে বিদেশীদের কাছে তুলে ধরতে হবে।’

বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটক কমার তথ্য পাওয়া গেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সেও (টিটিডিআই)। সূচকটি পর্যটন অগ্রাধিকার, উন্মুক্ততা, মূল্য প্রতিযোগিতা, পর্যটন অবকাঠামো ও সেবা, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে। শুক্রবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। ৭-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৩ দশমিক ৩৪। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তান। শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বৃহত্তর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায়ও নিচের দিকে বাংলাদেশের অবস্থান।

পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে হবে বলে মনে করেন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘বিদেশে আমাদের পর্যটক কেন্দ্রগেুলো নিয়ে যেভাবে ব্র্যান্ডিং দরকার, সেটা হচ্ছে না। আমরা ইতিবাচক প্রচারণা করতে পারছি না, তাই বিদেশীরা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বাংলাদেশে পর্যটক আকর্ষণের মতো অনেক স্পট থাকলেও সেখানে সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। সেগুলো যদি বাড়ানো যায় তাহলে ভালো সাড়া পাওয়া যাবে।’

বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত ট্যুরিজম ওয়াচ বলছে, বৈশ্বিক পর্যটন খাত এখনো প্রবৃদ্ধির মধ্যে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার পুনরুদ্ধার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দুর্বল এবং অসম। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটকপ্রবাহে আকাশপথের যোগাযোগ, আঞ্চলিক হাবের বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশে পর্যটক আগমনের ক্ষেত্রে নানামুখী বাধা দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান শরীফুল আলম খন্দকার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পর্যটক আসার বিষয়টি ইন্টিগ্রেডেট প্যাকেজ। এর সঙ্গে ৩০০টি খাত জড়িত। পর্যটক আনতে হলে আমাদের ভিসা জটিলতা সহজ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকবল খাতের উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাটা জরুরি। এছাড়া হসপিটালিটি খাতে বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টদেরও যুক্ত করা যেতে পারে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তৈরি ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টের তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে আসা বিদেশী দর্শনার্থীদের প্রায় ৪৯ শতাংশই ব্যয় হয় আবাসনের পেছনে। এছাড়া খাবার ও পানীয় ১৯ শতাংশ, কেনাকাটা, অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ব্যয় ১৩ শতাংশ এবং পরিবহনে ৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে রিসোর্ট, হোটেল-মোটেল নির্মাণ, ইকোপার্ক, ট্যুরোজম পার্কসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও বিদেশী পর্যটক আকর্ষণ করা যায়নি। বর্তমানে নতুন করে ৬০টি প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে পর্যটন করপোরেশন। দেশের আটটি পর্যটন অঞ্চলে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব প্রকল্পের অধীন বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ২১ সেপ্টেম্বর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা এবং এর বিকাশে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক জিয়াউল হক হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের আটটি জোনে আমরা ৬০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কাজ করছি। এসব মেগা প্রকল্পের মধ্যে কক্সবাজার, সিলেট ও উত্তরবঙ্গে বেশি প্রকল্প নেয়া হবে। এর মধ্যে বহুমাত্রিক পর্যটক কেন্দ্র, শিশু বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট, হোটেল-মোটেল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এখানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও বিনিয়োগ আসবে।’

দেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) পর্যটন খাতের অবদান মাত্র ৩ শতাংশ। সেটাকে বাড়িয়ে ৭-১০ শতাংশে নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা চালুর পাশাপাশি দক্ষ পর্যটন গাইড তৈরি, ঐতিহ্যবাহী ও আঞ্চলিক রান্নার প্রসার এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছে সরকার।

নতুন ৬০টি প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পর্যটন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের টার্গেট হচ্ছে স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটক দুটোই বৃদ্ধি করা এবং এ খাতকে উন্নত করা। এ উদ্দেশে আমরা অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। অতীতে কক্সবাজার, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন পর্যটক কেন্দ্রে অনেক রিসোর্ট করেছি, হোটেল-মোটেল করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে পর্যটক কমে গেছে। সেসব জায়গায় আবারো পর্যটকদের আকর্ষণ করতে আমরা নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে চাই। পর্যটনের জন্য মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। যদি সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় তাহলে এর ভালো ফলাফল সামনের দিনে দেখতে পাবেন।’

আরও