দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গত সাত বছরে (২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। সে হিসাবে এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে তিনেরও বেশি শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। নিহত শিশুদের ৩৭ শতাংশের বেশি ছিল মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। আর প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশু প্রাণ হারিয়েছে পথচারী হিসেবে সড়ক পারাপার ও চলাচলের সময়। এসব তথ্য দিয়েছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
অন্যদিকে গত ১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রাণ হারিয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির অভিযোগ, পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির কারণে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮৪ জনের বয়স ছিল ৬ থেকে ১২ বছর। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ জন। আর পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ১ হাজার ৫৩২ জন। অর্থাৎ নিহত শিশুদের বড় অংশই স্কুলপড়ুয়া ও কিশোর বয়সী।
নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ১৯৩ জন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ছিল। পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮১২ জন। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু। পথচারী হিসেবে নিহত শিশুদের ৪৫ শতাংশের বেশি মারা গেছে তিন চাকার যানবাহনের ধাক্কায়। ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ১২৬ শিশু।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭১৩ শিশু নিহত হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। আঞ্চলিক সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮২ জন এবং মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ শিশু। শহরের সড়কে নিহত হয়েছে ১ হাজার ১৯৪ শিশু। নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৫১৩ জন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে এবং ৯৬২ জন বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ হারিয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, শিশুবান্ধব সড়ক ব্যবস্থার অভাব, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের কারণে শিশুমৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। গ্রামীণ সড়কে বসতবাড়ির কাছ দিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও সেখানে নিয়ম মানার প্রবণতা ও আইন প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে সড়কনির্ভর যোগাযোগ বাড়ানোর নীতির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। তার মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং সড়ক নির্মাণের ত্রুটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
দুর্ঘটনা কমাতে শিশুদের নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা এবং গণপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে দুই সংগঠন। যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার, চালকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন সরিয়ে নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।