তখনো জানতেন না পাকিস্তানি সৈন্যরা তার বন্ধু ও মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দেকে হত্যা করেছে

স্কট কার্নি ও জেসন মিকলিয়ানের ‘দ্য ভরটেক্স: দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য হিস্টোরি’জ ডেডলিয়েস্ট স্টর্ম অ্যান্ড দ্য লিবারেশন ওয়ার অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার সাইক্লোন যে পাকিস্তানের ইতিহাস বদলে ভূমিকা রেখেছিল, পূর্ব বাংলার মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল সে বিবরণই পাওয়া যায় এ গ্রন্থে। আর এ ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র ভোলার সন্তান, জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তারকা ফুটবলার থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরের বীর যোদ্ধা। ‘দ্য ভরটেক্স’ গ্রন্থ অবলম্বনে হাফিজ উদ্দিন আহমদের সেই যাত্রার গল্প থাকছে মার্চের বিশেষ আয়োজনে। আজ প্রকাশ হচ্ছে তৃতীয় পর্ব

অপারেশন সার্চলাইটের তিনদিন পর...

হাফিজ এবং তার সেনারা ভারত সীমান্ত থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরলেন। কিন্তু তখনো তারা জানতেন না দেশে আগুন জ্বলে উঠেছে। তিনি জানতেন না যে পাকিস্তানি সৈন্যরা তার বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে এবং তার পরিবারকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি জানতেন না যে পাকিস্তানি সেনারা তার অধ্যাপকদের গ্রেফতার করে তাদের পুরনো হলের ফুটবল মাঠে হত্যা করেছে। আর তিনি জানতেন না যে সেনাবাহিনী বাংলা বদ্বীপের প্রতিটি সশস্ত্র বাঙালিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা করছে।

এক সপ্তাহেরও বেশি প্রশিক্ষণ শেষে, এক পাঞ্জাবি কর্নেল তাদের জিপ জব্দ করে ব্যাগ ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ ২০ মাইল মার্চ করে ক্যান্টনমেন্টে ফেরার নির্দেশ দিয়েছিল। সাধারণত কোনো প্রশিক্ষণ শেষে সৈন্যরা একটু বিশ্রাম নিতেন। অতিরিক্ত কঠোর হলেও তারা আদেশ অনুসরণ করলেন। হাফিজ তার সৈন্যদের পথে রেডিও চালু করতে দিলেন, কিন্তু যেখানেই তারা ডায়াল ঘোরালেন শুনতে পেলেন শুধু পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত। তখন কেবল সামরিক চ্যানেলগুলোই কাজ করছিল।

যখন অপারেটর বাঙালি ইউনিটের অবস্থান ঘাঁটিতে পাঠাল, শুধু সংক্ষিপ্ত উর্দু উত্তর পাওয়া গেল। একজন ব্রিগেড কমান্ডার বলেন, শোনা যাচ্ছে যে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এবং সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের জবাব দিতে ট্রুপস সংগঠিত করা হচ্ছে। হাফিজ বিস্তারিত জানতে চাইলেন—তবে কেউ উত্তর দিলেন না।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভাবলেন, ‘এটি কি সহায়তা চাওয়ার কোনো বার্তা ছিল? হেলিকপ্টার পাঠানোর জন্য? আমি নিশ্চয়ই ভুল শুনেছি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জলিল জানবেন কী করতে হবে।’

হাফিজ ক্যান্টনমেন্টের গেট পার হয়ে দেখলেন কোনো নতুন আদেশ দেয়া হয়েছে কিনা। কিছু না দেখে তিনি খুশি হলেন। অনেকটা পথ মার্চ করে পুরো ইউনিট ক্লান্ত ও ধুলোয় ঢাকা। তার অধীনের দুইশ বাঙালি সৈন্য তাদের অস্ত্র অস্ত্রাগারে জমা দিলেন। তারপর লোহার গেট বন্ধ করে তাদের বাঙ্কারে শুয়ে পড়লেন। হাফিজ ক্লান্ত ছিলেন। বালিশে মাথা রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘুমিয়ে যান।

পরের সকালও হাফিজের ক্লান্তি যাচ্ছিল না। তার পেশি ব্যথা করছিল। তিনি অফিসার্স কটেজের বাথরুমে গিয়ে মুখে পানি ছিটালেন। আয়নায় দেখলেন নিজের ফোলা, রক্তলাল চোখ।

একজন আর্দালি এসে বলল, ‘স্যার! অস্ত্রাগার তালা দেয়া হয়েছে! ব্রিগেড কমান্ডার চাবি নিয়ে

এরপর » পৃষ্ঠা ৯ কলাম ১

বলেছেন বাঙালিরা আর অস্ত্র বহন করতে পারবে না। আমরা নিরস্ত্র!’ আতঙ্কে সেই আর্দালির কণ্ঠ কাঁপতে লাগল।

হাফিজ বুঝতে পারছিলেন না—সেনাকে কেন নিরস্ত্র করা হবে? ঘাঁটির পরিস্থিতি কি এত দ্রুত খারাপ হতে পারে?

আর্দালি আরো বলল, ‘তারা বলছে যে বালুচ রেজিমেন্ট ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অস্ত্রাগার খালি করে ফেলবে!’

হাফিজ চকচকে জুতো ও স্টার্চড সাদা শার্ট বেছে নিলেন। লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হাফিজের একমাত্র জুনিয়র অফিসার। দারুণ রাগ নিয়ে সে বলল, ‘অস্ত্র ছাড়া আমরা সেনা হতে পারি না। অফিসে পৌঁছার মুহূর্তে আমি আমার বেল্ট কমান্ডারের পায়ের কাছে ফেলে দেব এবং পদত্যাগ করব। বাঙালিরা এমন পরিস্থিতি (নিরস্ত্র করা) মেনে নিতে পারে না।’

হাফিজ আনোয়ারকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিলেন। বললেন, ‘এটি হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

হাফিজ প্রধান কার্যালয়ে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন টি জে (আবুল হাসেম) গুলির বেগে দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। তিনি উপলব্ধি করলেন কিছু একটা ঘটছে। জুনিয়র অফিসারদের সঙ্গে হাফিজ জলিলের অফিসে পৌঁছলেন।

‘কী হয়েছে, স্যার?’ হাফিজ জিজ্ঞাসা করলেন। জলিলের চোখে পানি—‘আমরা নিরস্ত্র।’

‘আমরা কী করব, স্যার?’ হাফিজ জিজ্ঞাসা করলেন।

সব মিলিয়ে, তারা বাতাসে বিপদের ঘ্রাণ পাচ্ছিলেন। অন্য বাঙালি সৈন্যরাও অস্ত্রাগারের দিকে ছুটল। অস্ত্রাগারে ঢুকে সবাই অস্ত্র নিয়ে নিল। টি জে নির্দিষ্টভাবে তার পছন্দের মেশিনগান নিলেন।

প্রথম গুলির শব্দ হলো। কোনোমতে সাধারণ পোশাকে বের হয়ে আসা সৈন্যরা আকাশে গুলি ছুড়ল। এভাবে বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করল। এ বিদ্রোহ ছিল এলোমেলো। টি জে ঘাঁটির পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে গিয়ে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিলেন।

মধ্যবর্তী প্রাঙ্গণে একটি মর্টার বিস্ফোরিত হলো। হাফিজ জলিলের জানালার দিকে ছুটে গেলেন। একজন মেজর অফিসে ঢুকে চিৎকার করে বললেন, ‘ইউনিট পুরোপুরি বিদ্রোহ করেছে!’

জলিল কেবল অবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা ঝাঁকালেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ সম্ভব নয়। এটা সম্ভব নয়।’

রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামানো হাফিজ ভাবতেন দেশের বিভিন্ন সমস্যা কোনো একভাবে সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এখন বাইরে উড়ে চলা গুলিগুলো ছিল এক বাস্তবতা। প্রতিটি গুলি তাকে একটি পক্ষ বেছে নেয়ার দাবি জানাচ্ছিল। পুরো বাঙালি ইউনিট তখন শত্রু পাকিস্তানিদের মধ্যে খোলা ময়দানে বিদ্রোহ করেছে।

টি জের মন্ত্র ছিল: ‘মারা যাওয়ার আগে মারো।’ তিনি দীর্ঘদিনের প্রতিশোধ নিলেন—শুধু পাশের গ্রামে সংঘটিত ধর্ষণ ও হত্যা নয়, বরং উর্দুভাষী সহকর্মীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে অপমানিত হওয়ারও। তারা তার প্রিয় বাংলা ভাষাকে ‘মেয়েলি’ বলেছিল। তারা কখনো এ মর্যাদা দেয়নি যে তিনি পাকিস্তানের জন্য নিজের রক্ত দিয়েছেন। আজ, তিনি ঘণ্টা বা কয়েক মিনিটের জন্য বেঁচে থাকলেও বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়ে সম্মানিত হবেন।

হাফিজ অফিস থেকে বের হয়ে দেখলেন বাঙালি সৈন্যরা বিভিন্ন রকম পোশাকে প্রাঙ্গণে দৌড়াচ্ছে—স্টিল হেলমেট, আধা বোতাম আঁটা শার্ট, বুট। আবার কারো পায়ে জুতা নেই, কিন্তু তারা বন্দুকের বেল্ট ও গ্রেনেড বহন করছে।

‘জয় বাংলা’ ধ্বনির সঙ্গে গুলির শব্দ। একজন অস্ত্রাগার থেকে মর্টার নিয়ে বের হলো এবং তৎক্ষণাৎ মর্টার শেল ছোড়া শুরু করল। কেউ কেউ হয়তো দিনের পর দিন বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু এ মুহূর্তে বোঝা গেল, কেউ আসলে পরিকল্পনা করেনি। কেউ নেতৃত্বেও নেই।

অন্যদিকে পাকিস্তানিরা পুনরায় অবস্থান নিচ্ছিল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা ছিল অনেক বেশি। মাত্র সাড়ে তিনশ বাঙালি সৈন্যের বিরুদ্ধে হাজারের বেশি পাকিস্তানি সেনা ও অফিসার। সময়ের ব্যাপার মাত্র, কখন তারা বাঙালিদের অবস্থানগুলো দখল করবে। পাকিস্তানি কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে অবস্থান নিচ্ছিল এবং দুইদিক থেকে গুলির জবাব দিচ্ছিল। সবাই জানে বিদ্রোহের শাস্তি মৃত্যু, তাই এখন আত্মসমর্পণের কোনো মানে নেই।

একটি গুলি হাফিজের পাশে সিমেন্টের কলামে আঘাত করল। তিনি সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, তখন একজন সার্জেন্ট খোলা মাঠ পার হয়ে দৌড়ে এল।

‘স্যার, আমরা কী করব?’ হাফিজের কাছে এ ছিল তার প্রশ্ন।

হাফিজ পুরো পরিস্থিতিটা ভালোভাবে হিসাব করে নিচ্ছিলেন। সেই সময়ের বিরাট দায়ভার তিনি অনুভব করছিলেন। জলিল আর বাঙালিদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থায় নেই।

‘স্যার, আমি একটি কথা বলতে চাই,’ সার্জেন্ট বলল। ‘আপনি শুনবেন কি?’

হাফিজ মাথা নাড়লেন।

‘আমি এ ইউনিটে পঁচিশ বছর লড়েছি। কিন্তু আমরা এখন জানি না সামনে কী হবে।’

‘আমি কী করতে পারি বলে আপনার মনে হয়?’ হাফিজ জিজ্ঞেস করলেন।

‘আপনি বাঙালি অফিসার, আর আমরা আপনার ভাই। আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি। আপনি না থাকলে কে আমাদের নেতৃত্ব দেবে?’

‘কিন্তু জলিল আমাদের কমান্ডার,’ হাফিজ আপত্তি করলেন।

‘কমান্ডাররা নেতৃত্ব দেয়।’

তখন পরিস্থিতি ছিল এটা যে হয় হাফিজকে এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব নিতে হবে অথবা সেই বাঙালি রেজিমেন্ট সেদিন ধুলোয় মিশে যাবে।

হাফিজ নিজেকে প্রস্তুত করলেন। পাকিস্তানের পেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। জীবন-সম্মান ও বাঙালির স্বাধীনতার জন্য তিনি নেতৃত্ব দেবেন। তিনি বিদ্রোহী, তিনি বাঙালি। তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন।

সেনাদের গুলি বন্ধ করার জন্য হাফিজ হাত তুলে ইশারা করলেন। তিনি বললেন, ‘এ মুহূর্ত থেকে এ যুদ্ধ আমার নির্দেশে চলবে।’ বাঙালি সেনারা গুলি বন্ধ করলেন। তারা তাদের নেতাকে পেয়ে গেছেন।

আরও