চাঁদপুরে নদীভাঙন রোধে প্রতি বছর অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। গত ১৫ বছরে শুধু চাঁদপুর শহর ও হাইমচর রক্ষায় সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৮২ কোটি টাকা। ওইসব এলাকায় ভাঙন বন্ধ হলেও নদীতীরবর্তী অন্যান্য অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শহর রক্ষা প্রকল্পে আরো ৮২৭ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা এবং স্থায়ী পদক্ষেপ না নেয়ায় ভাঙন থামছে না বলে মনে করে নদীতীরবর্তী মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে তারা একটি মেগা প্রকল্প প্রস্তুত করেছেন। সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন। অনুমোদন হলে নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব হবে।
নদীতীরের বাসিন্দারা জানান, পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা নদীর তীরঘেঁষে চাঁদপুর জেলার অবস্থান। দক্ষিণে নরসিংহপুর নামে একটি স্থান ছিল যা এখন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছরই চাঁদপুরে নদীপাড়ের মানুষ ভাঙনের শিকার হয়। ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর, ইব্রাহিমপুর, আলুবাজার, হানারচর, বাখরপুর, দক্ষিণ বালিয়া, সফরমালি, কানুদি, বাঞ্ছারামপুর, হরিণা ফেরিঘাট, শহরের টিলাবাড়ী, দর্জিবাড়ী, পুরান বাজার, দক্ষিণ গুনরাজদি, মৈশাদী, ইচলী। এছাড়া হাইমচর উপজেলার আলগি, চরভৈরবী, নীলকমল, হাইমচর ইউনিয়ন, কাটাখালীসহ মতলব দক্ষিণ ও উত্তরে সিপাইকান্দি, মেঘনা-ধনাগোদা বাঁধের বিভিন্ন অংশে প্রতি বছর ভাঙন দেখা দেয়। স্থায়ী পদক্ষেপ না নেয়া এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মেঘনার ভাঙন রোধে চাঁদপুর শহর ও হাইমচর রক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার দুই স্তরে ২৮২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তবে শহর ও হাইমচর রক্ষা বাঁধ ছাড়া অন্যান্য স্থানে ভাঙন লেগেই আছে। প্রথম পর্যায়ে চাঁদপুর শহর রক্ষায় ১৫৫ কোটি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে হাইমচর উপজেলা রক্ষায় ১২৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়। এতে সময় লেগেছে প্রায় ১৫ বছর, যা বর্তমান সরকারের সময় হয়েছে।
এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি টাকার কাজ চলমান। হাইমচর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকায়, সদর উপজেলার বাঞ্ছারামপুর, ইব্রাহিমপুরে এ কাজ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে নদী শাসন কাজ চলছে। এছাড়া শহর সংরক্ষণে চলমান রয়েছে যমুনা রোড এলাকায়। এ কাজে কতটুকু সমাধান হবে তা এখন দেখার বিষয়। ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারির দিকে নতুন বরাদ্দের কাজ পুরোদমে শুরু হবে।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাঁদপুর শহর ও হাইমচর রক্ষায় ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকার স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চল রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২৮২ কোটি টাকার মধ্যে চাঁদপুর শহর রক্ষা প্রকল্পে ৪.৪ এবং হাইমচর উপজেলায় ৬.৪ কিলোমিটার এলাকায় ব্লক ফেলে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া চাঁদপুর শহর ও হাইমচর উপজেলায় গত তিন বছরে নদীর তীর সংরক্ষণে ১৯০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ১৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে এ সংস্কাকাজ করা হয়। সদর উপজেলার আলুর বাজার এলাকায় ভাঙন রোধে চলতি অর্থবছরে ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭০ কিলোমিটার নদী সংরক্ষণ কাজ করা হয়।
স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ৮২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প চলতি মাস থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। প্রকল্পটি অনুমোদনের ফলে পুরো শহরকেই ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে বলে জানান চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী।
এদিকে চলতি বছর চাঁদপুর শহরের যমুনা রোড বকুলতলা এলাকায় মেঘনা নদীর স্রোতে শহর রক্ষা বাঁধের ৫৬ মিটার ধসে পড়ে। এতে শতাধিক পরিবার ভাঙনের মুখে পড়ে। যদিও ভাঙন নিয়ন্ত্রণে জিও ব্যাগসহ সংস্কারকাজ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
চাঁদপুর শহর রক্ষা প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মোশারফ জানান, শহরের পুরান বাজার মন্দির এলাকা অরক্ষিত থাকায় বর্ষায় সংস্কারকাজ হয়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংস্কারকাজ ও নদী শাসন চলছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে একনেকে একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রকল্পটির জন্য আন্তরিক ছিলেন। শিগগিরই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারব।’