বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট

গবেষণার নামে ১৫ উটপাখিকে জবাই, ১৩৪ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের অর্জন ‘শূন্য’

সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) একটি নিরিবিলি শেডে ঘুরে বেড়ায় দুটি উটপাখি। কয়েক বছর আগে যদিও এখানে দৌড়ে বেড়াত ২২টি আফ্রিকান উটপাখি।

গবেষকদের তখন ভাষ্য ছিল, একদিন হয়তো বাংলাদেশের খামারেও গরু-খাসির বিকল্প হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে পালন হবে উটপাখি। উদ্ভাবিত হবে দেশীয় পরিবেশে মানিয়ে নেয়া নতুন জাত, বাড়বে মাংসের উৎপাদন।

১৩৪ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সে স্বপ্নের বাস্তবতা এখন প্রশ্নের মুখে। গবেষণার দৃশ্যমান কোনো ফল নেই, নেই বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের উদ্যোগও। বরং গবেষণার জন্য আনা অধিকাংশ উটপাখিই আর বেঁচে নেই। এর মধ্যে ১৫টি জবাই করা হয়েছে, তিনটি মারা গেছে। দুটির আবার হদিস নেই। আর অবশিষ্ট দুটি নিয়েই চলছে গবেষণার শেষ অধ্যায়। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে রয়েছে স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।

বিএলআরআই ২০১৯-২০ অর্থবছরে ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারিদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর। এ প্রকল্পের একটা বড় আকর্ষণ ছিল গরু-খাসির বিকল্প মাংসের উৎস খুঁজে বের করতে আফ্রিকা থেকে উটপাখি এনে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খাপ খাওয়ানো এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক খামার সম্প্রসারণের পথ তৈরি করা। এরই অংশ হিসেবে দুই দফায় ২২টি উটপাখি আফ্রিকা থেকে আনা হয়। এর মধ্যে ২০২০ সালে আনা হয়েছিল সাতটি উটপাখি। পরে অধিকতর গবেষণার জন্য আরো ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি নিয়ে আসা হয়।

এ গবেষণা প্রকল্পটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকার। শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী আফ্রিকা থেকে আনা এসব প্রাণী সহজেই পালন করা যাবে। প্রাপ্তবয়স্ক একটি উটপাখি ১০০ থেকে ১৫০ কেজি ওজনের হয়। এরা আড়াই বছর বয়সে ডিম দিতে পারে। বছরে ডিম দেয় ২০ থেকে ২৫টি। এ হিসাবে একটি উটপাখি কমপক্ষে দুটি দেশীয় গরুর সমান মাংসের চাহিদা পূরণে সক্ষম। শুধু তা-ই না, বাণিজ্যিকভাবে মাংস বাজারজাত করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাজেদুল করিম। তবে ছয় বছর পর সে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বিএলআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২২টি উটপাখির মধ্যে ১৫টি জবাই করা হয়েছে মাংসের গুণগত মান ও স্বাদ (সেন্সরি ইভ্যালুয়েশন) পরীক্ষার জন্য। তিনটি মারা গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যে গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল একটি নতুন প্রাণীকে বাংলাদেশের পরিবেশে অভিযোজিত করা, সেখানে অধিকাংশ প্রাণীই যদি গবেষণার মাঝপথে জবাই হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ভিত্তি কোথায়? গবেষণা-নৈতিকতার দিক থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের আবহাওয়ায় এ পাখি পালন এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের চিন্তা বেশ সুদূরপ্রসারী। উটপাখি আমাদের দেশের প্রাণী নয়। ফলে এ পাখির ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো বা মাংসের চাহিদা মেটানো কিছুটা কষ্টসাধ্য। তাছাড়া গবেষণার অংশ হিসেবে প্রাণী জবাইয়ের প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু ২২টির মধ্যে ১৫টি জবাই করার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’

বাংলাদেশের জলবায়ু, কৃষি-অর্থনীতি এবং ভোক্তা চাহিদা বিবেচনায় উটপাখি পালন কতটা লাভজনক ও বাস্তবসম্মত সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাছাড়া একটি গবেষণা প্রকল্পের সফলতা শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং তার ফলাফল কতটা মাঠে পৌঁছেছে, সেটিই মূল বিবেচ্য। তবে গবেষণায় সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও থাকতে পারে বলে মনে করেন উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

ড. সাজেদুল করিম সরকারের অধীনে উটপাখি নিয়ে পিএইচডি করেছেন হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গবেষণা মানে সব সফল হতে হবে, এমন না। এখানে ব্যর্থতাও থাকতে পারে। উটপাখি নিয়ে আমি পিএইচডি করেছি। যেহেতু এটা আমাদের আবহাওয়ার কোনো প্রাণী না, ফলে এখানে সফল হতে বেশ কয়েক ধাপে কাজ করতে হবে। একবারের কাজে সফলতা আসবে না।’

১৫টি উটপাখি জবাই করার বিষয়ে খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গবেষণার প্রয়োজনে মাংসের স্বাদ পরীক্ষা করতে এটি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত সাজেদুল করিম স্যার বলতে পারবেন। আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।’

বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার সাজেদুল করিমের অফিসে যাওয়া হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও মেলেনি কোনো সাড়া।

​ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ স্বজনপ্রীতির। ল্যাবরেটরির জন্য মূল্যবান যন্ত্রপাতি কিনে নিজের স্ত্রীকে ল্যাবের ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা নেই, পুরো বিষয়টিই ঘটেছে কাগজে-কলমে। ​এছাড়া শ্যালক, ভাগ্নিজামাই, বোনের ভাসুরের ছেলে, ভাতিজির জামাতা, ভাগিনা, মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী, চাচাতো ভাই এবং স্ত্রীর বোনের দেবরসহ প্রায় ১৮ নিকটাত্মীয়কে এ প্রকল্পে চাকরি দিয়েছেন বলে অভিযোগ।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ড. শাকিলা ফারুকও এ বিষয়গুলো স্বীকার করেন। প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উটপাখিকে আমাদের দেশে এনে সংরক্ষণের জন্য গবেষণা করা হয়েছে। এখানে দেখা হয়েছে পাখিটি কী ধরনের খাবার খায়, কোন পরিবেশে তারা বেশি মানিয়ে নিতে পারে এবং এর মাংসের স্বাদ কেমন। এজন্য বেশকিছু পাখি জবাই করা হয়েছে। কিন্তু এটি আমাদের দেশের পাখি না হওয়ায় কিছুটা সময় লাগবে সুফল পেতে।’

শুধু উটপাখিই নয়, ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগও জবাই করে খেয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় যদিও বলা হয়েছিল, মোরগগুলো চুরি হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হলেও সে প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।

এসব বিষয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিএলআরআইয়ে যেসব বিষয়ের অনিয়ম সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্তকাজ চলছে। এটি নিয়েও তদন্ত করা হবে এবং এর রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।’

আরও