সাজেকে অবরোধ-সহিংসতায় আর্থিক ঝুঁকিতে পর্যটন খাতের বিনিয়োগকারীরা

সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকালে উজো বাজার এলাকায় পর্যটকদের গাড়িবহর আটকে দেন অবরোধকারীরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে অবরোধকারীরা ঢিল ছোড়েন।

মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি, সবুজ উপত্যকা আর পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ—প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে সারা বছরই সাজেকে ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এ পর্যটন কেন্দ্রটি গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় কটেজ ও রিসোর্ট। কিন্তু দফায় দফায় অবরোধ ও সহিংসতায় সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি সংগঠনের কয়েক দফা অবরোধ ও সহিংসতায় পর্যটকদের বুকিং বাতিল, অগ্রিম অর্থ ফেরতের প্রবণতায় ভরা মৌসুমে মন্দার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গতকাল সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বেলা আনুমানিক ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। সে সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয় এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়। এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাজেকে স্থানীয় দুই সংগঠনের অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেয়ার সময় গতকাল পাহাড়ের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি হয়েছে। ঘণ্টাখানেক পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরে সড়ক থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে পর্যটকদের নিরাপদে উজো বাজার এলাকা পার করে দেয়া হয়।

সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকালে উজো বাজার এলাকায় পর্যটকদের গাড়িবহর আটকে দেন অবরোধকারীরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে অবরোধকারীরা ঢিল ছোড়েন। একপর্যায়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। সেনাবাহিনী তখন পাল্টা গুলি চালায়। কিছু সময় গোলাগুলি চলে।’

এদিকে শনিবার রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ ডেকেছে ছাত্র-সংগ্রাম জনতার পরিষদ নামে একটি সংগঠন। গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) ‘সশস্ত্র’ সদস্যদের বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবিতে সেখানে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। এর অংশ হিসেবে বুধবার বিকালে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের তৃতীয় দফা অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। সেই সঙ্গে সাজেক থেকে পর্যটকদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

সাজেকে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের হিসাবে, এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি কটেজ আছে। কিছু কটেজ পাঁচ থেকে সাতটি রুমের। আবার কিছু কটেজে ১২ থেকে ১৫টি পর্যন্ত রুম রয়েছে। পর্যটনের ভরা মৌসুমে আড়াই হাজার পর্যটক থাকেন এসব কটেজে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এ তিন মাস মূলত সাজেকের পর্যটন সিজন মৌসুম। এ সময়ে কটেজ মালিকদের ব্যবসা হয় প্রায় ২৭ কোটি টাকার। পর্যটকরা খাওয়া-দাওয়া বাবদ খরচ করেন প্রায় ২২ কোটি টাকা। এছাড়া চান্দের গাড়িতে যাতায়াত, ঘোরাঘুরিতে পর্যটকরা ব্যয় করেন আরো প্রায় ২৭ কোটি টাকা। সাজেকের পর্যটন খাতের একাধিক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভরা মৌসুমকে সামনে রেখে সাজেকে নতুন অর্থ বিনিয়োগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। কটেজ ও রিসোর্ট সংস্কার, কক্ষের মানোন্নয়ন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছেন। কিন্তু চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটন ব্যবসায় বছরের সব সময় সমান আয় হয় না। ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি ও শীতের মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এ সময়ের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়ের তুলনামূলক কম ব্যবসার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন উদ্যোক্তারা। ফলে পর্যটন মৌসুমে বুকিং বাতিল হওয়া এবং পর্যটকদের অগ্রিম অর্থ ফেরত দেয়ার চাপ তাদের বড় সংকটে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন কেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকানপাট ও অন্যান্য সেবা খাতও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাজেকে কটেজ ও রিসোর্ট ব্যবসা রয়েছে মো. যুবরাজের। তিনি কটেজ ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের দপ্তর সম্পাদক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখন সাজেক পুরোপুরি পর্যটকশূন্য। আমি প্রায় ১ লাখ টাকার বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের অর্থ ফেরত দিয়েছি। অন্য ব্যবসায়ীদেরও একই অবস্থা। প্রশাসনিকভাবে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা ছাড়া বিকল্প নেই। এরই মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল আসেনি। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। এতে পর্যটন খাতে আমাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’

ব্যবসায়ীদের মতে, সাজেকের পর্যটন খাতকে সচল রাখতে হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ ও অবরোধের বিষয়ে কার্যকর সমাধান প্রয়োজন। পর্যটন কেন্দ্রটিতে ব্যবসা পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তাদের শুধু আবাসন-অবকাঠামো নির্মাণেই বিনিয়োগ করতে হয় না; কর্মীদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হয়। ফলে পর্যটক আসা বন্ধ বা কমে গেলে এসব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণের প্রধান ভিত্তি হলেও এ খাতের টেকসই বিকাশের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও স্থিতিশীল পরিবেশ জরুরি। সংঘাত ও অবরোধের কারণে পর্যটন মৌসুমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন উদ্যোক্তারা। তাই পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রশাসন দ্রুত বিরোধের সমাধান এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

কটেজ ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মো. ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে চারদিন বন্ধ থাকার পর পূজার ছুটিতে সাজেক খুলে দেয়া হয়। পর্যটন মৌসুমে আমাদের সবার ভালো বুকিং ছিল। কিন্তু সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে এখন বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা কটেজ ও রিসোর্ট সংস্কারে নতুন করে বিনিয়োগ করেছেন। আমরা বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেছি। প্রশাসন যদি এ পরিস্থিতির সুরাহা না করে, তাহলে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আমাদের সবাইকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’

আরও