শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে নোয়াখালীর সরকারি ও রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। দুটি প্যাকেজে নয়টি উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কথা রয়েছে। তবে দুই বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো জায়গায় কাজই শুরু হয়নি। ঠিকাদারও লাপাত্তা। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের সুফল পাচ্ছে না প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন প্যাকেজে ওয়াশ ব্লকের নির্মাণকাজ শেষ না করে বিল নিয়ে চলে গেছেন ঠিকাদার। এতে ঝুলে আছে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন অর্ধশতাধিক ওয়াশ ব্লক। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে নির্মিত ওয়াশ ব্লকে।
সরজমিন দেখা গেছে, প্রায় ৩৫ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত ওয়াশ ব্লক ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে দোতলা আধুনিক একটি ওয়াশ ব্লক বরাদ্দ হয় এ বিদ্যালয়ের জন্য। নির্মাণকাজে হাত না দেয়ায় দাপ্তরিক কাগজপত্রে অগ্রগতি শূন্যই রয়েছে। বারবার ধরনা দিয়েও কাজ শুরু করাতে পারেনি স্কুল কর্তৃপক্ষ। ফলে স্যানিটেশন ব্যবস্থার সুফল পাচ্ছেন না শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২২ সালের দিকে বিদ্যালয়ের জন্য একটি ওয়াশ ব্লক বরাদ্দ হয়। একবার ঠিকাদারও এসেছেন। কিন্তু বছর ঘুরলেও ওয়াশ ব্লকের কাজ শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে আমি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগেও গিয়েছি। কিছুদিন আগে কাজের মূল্যায়ন বিষয়ে একটি কাগজ দেয়া হয় আমাকে। সেখানে কাজের অগ্রগতি শূন্যই দেখানো হয়েছে।’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন মানে শুধু টয়লেট থাকা নয়, বরং নিরাপদ পানীয় জল, ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা ও পরিষ্কার টয়লেট, হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা (সাবানসহ) এবং স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা নিশ্চিত করা। যা শিক্ষার্থীদের রোগ প্রতিরোধ করে, উপস্থিতি বাড়ায় এবং তাদের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করে। এটি বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জানায়, অনেক পুরনো একটি ওয়াশরুম রয়েছে। যেটার দরজা ভাঙা, ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। অনিরাপদ, তার পরও দিনের বেলায় তারা সেটাই ব্যবহার করছে। একজন ভেতরে গেলে অন্যরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের খুব লজ্জা করে, তার পরও বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুটি প্যাকেজে ১৫টি ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ পায় চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএম এন্টারপ্রাইজ। পরে কাজটি দেয়া হয় সাবঠিকাদার মোজাম্মেল হককে। ১৫টি কাজের মধ্যে নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি। বাকি ১৪টির মধ্যে দুটির কাজ শেষ হলেও অন্যগুলোর ছাদ নির্মাণ করে চলে গেছেন ঠিকাদার।
কাজ ফেলে রাখায় স্কুলগুলোর ওয়াশ ব্লকের ইট-বালি ঝরে পড়ছে, ট্যাংকগুলো ভরে যাচ্ছে ঝোপঝাড়ে। এসব স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। শিক্ষকদের দাবি, গত দুই বছরেও দেখা মেলেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কারো। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ধরনা দিয়েও লাভ হয়নি কিছুই।
সদর উপজেলার বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ শাহ্ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর বাইরে শিক্ষকও রয়েছেন। অন্তত এক যুগ আগের একটি ওয়াশ ব্লক ব্যবহার করছি আমরা। ২০২২ সালে বিদ্যালয়ে দোতলাবিশিষ্ট একটি ওয়াশ ব্লকের কাজ অর্ধেক শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একাধিকবার গিয়েছি। কিন্তু দপ্তর থেকে আজ-কাল করে তিন বছর পার করেছে। অথচ আজ পর্যন্ত কাজ শেষ করেননি ঠিকাদার। এক বছরের বেশি সময় ধরে ঠিকাদারকেও পাওয়া যাচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএম এন্টারপ্রাইজ এবং সাবঠিকাদার মোজাম্মেল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
গত দুটি অর্থবছরে বেশ কয়েকটি প্যাকেজে দেড় শতাধিক ওয়াশ ব্লক নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। জেলার নয়টি উপজেলায় সরকারি ও রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মূলত এসব ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কথা।
দপ্তরটির একটি হিসাব বলছে, দুই অর্থবছরে টেন্ডার হওয়া বেশির ভাগ কাজই শেষ হয়েছে। তবে দুটি প্যাকেজের কাজ ৪০-৪৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮০ শতাংশ বিল উত্তোলন করে নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরটির সাবেক ও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অনেকে বিল উত্তোলনে ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছেন। যদিও এর দায় নিতে রাজি নন বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি এখানে আসার পর বেশির ভাগ ওয়াশ ব্লকের কাজ শেষ করা হয়েছে। ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছি। কিন্তু কিছু ঠিকাদার আমি খুঁজে পাইনি। ফলে ওই সব কাজ ঝুলে আছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার সময় কোনো ঠিকাদার অতিরিক্ত বিল নিতে পারেননি। আগের সময় যা হয়েছে, তার দায় আমি নেব না। তবে যেসব কাজ অসমাপ্ত রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ দেবে, সেভাবে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’