এরদোগানের একে পার্টিসহ তিন দেশের চার দলের আদলে নতুন দল করতে চান ছাত্ররা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের এক দফার পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের এক দফার পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তারই অংশ হিসেবে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতারা একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। আর এ নতুন দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরুণ নেতারা। তবে দলের কাঠামো ও আদর্শিক ভিত্তি কী হবে তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। নতুন দলের কাছে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রত্যাশা কী এবং নতুন বাংলাদেশ কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে একটি জরিপ চালানোর কথাও বলা হয়েছে এরই মধ্যে।

দল গঠনের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন তরুণ নেতা জানান, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এবং দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে তারা নতুন দল নিয়ে কাজ করছেন। সেই সঙ্গে একক কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের আদর্শে নয়; বরং বিশ্বব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিভিন্ন দেশের সফল রাজনৈতিক দলগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান। আপাতত তিন দেশের চারটি জনপ্রিয় দলকে নিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেগুলো হলো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি ও দেশটির অনেক পুরনো দল জাস্টিস পার্টি, পাকিস্তানের দল ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এবং ভারতের অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম-আদমি পার্টি। দলগুলোর গঠন ইতিহাস, আদর্শ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মোটো বা স্লোগানসহ বিভিন্ন বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি। অতীতের মতো নয় যে এটি ধারণ করা আদর্শ বা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেব। আমরা সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে যেতে চাই। এ রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে জনগণ কী প্রত্যাশা করে সে সম্পর্কে জনগণের কাছ থেকে সক্রিয় মতামত সংগ্রহ করতে এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই গ্রহণ করে সেটির বাস্তবায়ন করতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটি দেশব্যাপী জনগণের মতামত নেয়ার কর্মসূচি শুরু করেছে।’

প্রতিটি মানুষের নানা মত ও পথ রয়েছে উল্লেখ করে এ ছাত্রনেতা বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মানুষের নানান পথ এবং মতকে ধারণ করতে চাই। আমাদের নতুন রাজনৈতিক দলটি যেন এলিট না হয়ে যায়, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার না হয়ে যায়, নির্দিষ্ট বংশের না হয়ে যায় বা নির্দিষ্ট আদর্শের না হয়ে যায়। এটি যেন সব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়, তার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

নতুন দল গড়তে বিভিন্ন দেশের দলকে কেন অনুসরণ করা হচ্ছে তা নিয়ে বিস্তারিত কথা হয় জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে। তারা বলেন, যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে দিয়েছে, যার প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্যও তাদের অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের পিটিআই থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, কীভাবে ছোট একটি রাজনৈতিক শক্তি থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়। পাকিস্তানের জনগণ ও দলটির মধ্যে কেমিস্ট্রি কী ছিল। দেশটির কোন রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ইমরান খানের দলটি সফল হয়েছে—সেসব বিষয় অধ্যয়ন করা। আম-আদমি দলের কাঠামোটি খুব শক্ত। এর নেতৃত্ব অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডসহ বিদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা ভারতীয় নাগরিকদের রাজনীতিতে যুক্ত করেছে। তরুণদের অংশগ্রহণও অনেক বেশি। রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও তরুণদের আকৃষ্ট করতে দলটি কী কী নীতি গ্রহণ করেছিল, ছাত্র-জনতার নতুন দল গঠনেও তা খতিয়ে দেখা হবে। এরদোগানের একে পার্টির ব্র্যান্ডিং এবং পুরো তুরস্কজুড়ে মানুষকে সংযোগ করার ব্যাপারগুলো ও তাদের নির্বাচনী প্রচারণাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে তুরস্কের তরুণ ও উদারপন্থী মুসলিমদের টানতে পার্টির কৌশল কী ছিল তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আর জাস্টিস পার্টির ক্ষেত্রে দেখা হচ্ছে এর কাঠামো।’

ছাত্ররা নতুন দল গঠন করলেও জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিলুপ্ত হচ্ছে না। জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম হিসেবে সংগঠন দুটি কাজ করবে। নতুন দল গঠনের মাধ্যমে মূলত তৃণমূল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং সমাজের সব নাগরিকের আশা ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করা হবে বলে দাবি করেন ছাত্রনেতারা।

বিগত সময়ের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এড়িয়ে চলতে চান ছাত্রনেতারা। এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী যে লড়াই, সে প্রত্যাশার বাস্তবায়ন মানুষ নতুন রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে দেখতে চায়। আমরা চেষ্টা করছি, সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ যেন এখানে একতাবদ্ধ হয়। নতুন রাজনৈতিক দলে কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি হবে না। আমরা একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতির বিকাশ ঘটাতে চাই।’ নতুন দলের নাম অবশ্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, বর্তমানে দলটির ঘোষণাপত্রের কাজ চলছে। পরে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নতুন দলের নাম নির্ধারণ ও ঘোষণা করা হবে। শুরুতে ১৫০-২০০ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে দলের প্রধান বা আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলামের নামের বিষয়ে প্রায় সবাই একমত হয়েছেন। কিন্তু তিনি সরকারে থাকায় রাষ্ট্র ও তার সম্মতির জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেনের ব্যাপারে অধিকাংশ নেতাকর্মী একমত। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দলের এ পদে আরো বেশ কয়েকজনের নামও শোনা যাচ্ছে। প্রতীকের বিষয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। কেউ বলছেন রিকশা; কেউবা ইলিশ মাছের বিষয়ে মত দিয়েছেন। তবে এ বিষয়টিও চূড়ান্ত হবে জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে। আর এসব বিষয় চূড়ান্ত হতে আরো সপ্তাহ দুয়েক লেগে যেতে পারে।

নতুন দলে কারা ঠাঁই পাবেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় বিধি ও আমাদের দলের যে নিয়মনীতি রয়েছে সেটা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কেউ উপদেষ্টা হোক বা বড় কর্মকর্তা হোক না কেন, তাকে নিয়ম মেনেই দলে আসতে হবে। কেউ উপদেষ্টা পদে থাকাকালীন এ দলের সদস্য হতে পারবেন না। অবশ্যই তাকে উপদেষ্টার পদ ছেড়ে আসতে হবে।’

নতুন রাজনৈতিক দলে নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের ফ্রন্টলাইনে নারীদের যদি না দেখি তাহলে মনে করতে হবে যে আমরা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্মাণে পিছিয়ে আছি। এরই মধ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটির বিভিন্ন ফোরাম ও থানা কমিটি থেকে শুরু করে ওপরের দিকের বিভিন্ন কমিটিতে অন্তত ২৫ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে আমরা নারীর অংশগ্রহণকে শতাংশ হিসেবে দেখি না বা কোটা পূরণের জন্য নারীকে যুক্ত করি না। একজন নারী তার নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারল কিনা সেটি নিশ্চিত করি। শতাংশ কিংবা সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা নারী নেতৃত্বকে আরো নষ্ট করে দেয়।’

নতুন দল গঠন হবে সর্বস্তরের জনমতের ভিত্তিতে। অনলাইনে এক লাখ ও অফলাইনে এক লাখ মানুষের থেকে পরামর্শ নেয়া হবে। অনলাইনের ক্ষেত্রে এমসিকিউ পদ্ধতিতে প্রশ্ন থাকবে, সবাই গুগল ফর্মের মাধ্যমে সেটি পূরণ করবে। এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যেটি গত ৫৩ বছরেও হয়নি। আমরা প্রান্তিক জনগণের কাছে গিয়ে তাদের মতামত নিয়ে আসব। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলতে আমরা কেবল বুঝি ভোট দেয়া-নেয়া। কিন্তু আমরা কেবল এ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে চাই না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জায়গাটা সুনিশ্চিত করতে চাই।’

আরও