রাজধানীর দ্বিতীয় দ্রুতগতির উড়াল সড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়ার মধ্যে। উড়াল সড়কটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে। শুরু থেকেই এ প্রকল্পে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় করছে সরকার। তবে অর্থ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকলেও বিলম্বিত হচ্ছে এর বাস্তবায়ন। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের জুনে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এর জন্য আরো অন্তত দেড় বছর সময় বেশি লাগতে পারে। মেয়াদের সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, উড়াল সড়কটির চলমান নির্মাণকাজের কারণে আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। যানজটের পাশাপাশি বৃষ্টি হলে কাদা-পানি আর শুষ্ক আবহাওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত ধুলাবালিতে ভোগান্তি পোহাচ্ছে এ পথের যাত্রীরা।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন করে তৎকালীন সরকার। শুরুতে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ছিল ২০২২ সালের জুন। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে এ প্রকল্প। সময়মতো ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় প্রকল্পটি মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
প্রকল্প কার্যালয় থেকে গতকাল জানানো হয়েছে, উড়াল সড়কটির ভৌত কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। নির্ধারিত মেয়াদ অনুযায়ী আট মাসের মধ্যে ভৌত কাজের অবশিষ্ট ৪৫ শতাংশ শেষ করতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভব নয় বলে উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণচুক্তি বিলম্বিত হওয়ায় ডিপিপি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। অবশিষ্ট নির্মাণকাজ প্রকল্প মেয়াদে অর্থাৎ জুন ২০২৬-এ সম্পন্ন হবে না। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় করা হলেও কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি শেষ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নিয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে আমরা চুক্তি করেছি ২০২২ সালের অক্টোবরে। চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদার ৫ বছর ২ মাসের মাথায় সমস্ত কাজ শেষ করবে। অর্থাৎ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার জন্য আমরা ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করেছি। এ সময়ের মধ্যেই যেন কাজ শেষ হয়, সে লক্ষ্যে আমরা ঠিকাদারের কাজ তদারক করে যাচ্ছি।’
২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাবে।’
দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোর একটি আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় যাত্রীবাহী পরিবহনের পাশাপাশি এ মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ধীরগতির নির্মাণকাজ ও প্রকল্প এলাকায় ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে এ মহাসড়কে ব্যাপক যানজট দেখা দিচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়ছে সড়ক ব্যবহারকারীরা।
আইএমইডির প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের নির্মাণাধীন স্থানে ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে ঠিকাদারের তেমন কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। চুক্তি মোতাবেক নির্মাণাধীন স্থানে ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের নির্মাণাধীন এলাকায় ধুলাবালি পরিলক্ষিত হয়েছে। ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো হলেও তা যথেষ্ট নয়।
এদিকে প্রকল্পের কাজ মাঝ পর্যায়ে এসে কিছু স্থানে নকশা সংশোধন ও নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতাভুক্ত নবীনগর ইন্টারসেকশনে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ৭১০ মিটার দীর্ঘ চার লেন ফ্লাইওভারের পরিবর্তে সাভার থেকে চন্দ্রামুখী এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দুই লেনের ফ্লাইওভার এবং চন্দ্রা থেকে আরিচামুখী দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি দুই লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। সাভার ইপিজেড থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার জন্য দুটি র্যাম্পসহ একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ইউলুপ নির্মাণ করা হবে। জিরাবো ইন্টারসেকশনে চারটি র্যাম্প নির্মাণ করা হবে। মিরপুর বেড়িবাঁধ ইন্টারসেকশনে দুটি র্যাম্প নির্মাণ করা হবে।
নকশা সংশোধন প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জনগণের সুবিধার জন্য ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাইপাইল এলাকায় নির্বিঘ্নে যান চলাচলের জন্য একটি ইন্টারসেকশন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ রকম আরো কিছু ক্ষেত্রে নকশায় পরিবর্তন, সংযোজন আনা হচ্ছে।’
নকশাগত এসব পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বাড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নকশা সংশোধন, সংযোজন করে ডিপিপির সংশোধন প্রস্তাব করেছি। প্রস্তাবিত ডিপিপিতে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। কত বেড়েছে তা এই মুহূর্তে আমরা প্রকাশ করতে চাইছি না।’