তাদের হারিয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা এক যুগের বেশি সময় ধরে কেড়ে নেয়া হয়েছিল।’
গতকাল বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে এসে পৌঁছালে হাজারো সমর্থক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে সরকারপ্রধানকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। সকল প্রকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল, হরণ করা হয়েছিল তাদের ভোটের অধিকার। আমরা দেখেছি কীভাবে উন্নয়নের নামে প্রতারণা-লুটপাট করা হয়েছে। অথচ আমরা নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সেই কাজের বাস্তবায়ন আমরা শুরু করছি পর্যায়ক্রমিকভাবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমরা দেশের মানুষকে বলেছিলাম আমরা কীভাবে দেশ পরিচালনা করব। আজকে এই বগুড়ার গাবতলীতে আমরা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে এসেছি। দেশের মানুষের সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয় আল্লাহর রহমতে তাহলে এ দেশের মায়েদের স্বাবলম্বী করার জন্য আমরা ফ্যামিলি কার্ড চালু করব। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা শুরু করেছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘শুধু তা-ই নয়, এখানে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি বলেছিলাম, বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, তাহলে আমরা দেশের কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াব, মা-বোনদের যেমন ফ্যামিলি কার্ড দেব, কৃষক ভাইদের আমরা কৃষি কার্ড পৌঁছে দেব। কৃষক ভাইদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ আছে, সেই কৃষি ঋণ সুদসহ আমরা মওকুফ করব। আল্লাহর রহমতে আপনাদের দোয়ায় সেই কাজটি সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করেছি। যার ফলে সারা বাংলাদেশে ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ হয়ে গেছে সুদসহ।’
রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির ধুয়া তুলে কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা দেখছি—যারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তারা তো এ দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেনি, এ দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করেনি। দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করে না, তাদের কি বিশ্বাস করা যায়? তাদের বিশ্বাস করা যায় না। কোনো বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে আমরা পা দেব না।’
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আজ এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মিডিয়ার সামনে পরিষ্কারভাবে আমি আবারো বলে দিতে চাই—সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর আমরা ইনশা আল্লাহ এক এক করে বাস্তবায়ন করব। কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেয়ার পরও আমরা দেখলাম যে কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে।’ সংস্কার দাবির নামে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জনসভা শুরুর আগেই দুপুর থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় আসতে শুরু করেন। বেলা ৩টার মধ্যে পুরো মাঠ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মাঠ প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কগুলোতেও নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানের এটিই প্রথম নিজ জেলা বগুড়া সফর। গতকাল সকাল ৬টা ১০ মিনিটে তাকে বহনকারী বাস বগুড়ার উদ্দেশে গুলশানের বাসভবন ছেড়ে যায়। তার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে বগুড়া সার্কিট হাউজে পৌঁছান সকাল ১০টার দিকে। এরপর তিনি জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনের ফলক উন্মোচন ও আদালত ভবন থেকে বগুড়াসহ সাত জেলায় ই-বেইল বন্ড কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন বগুড়া সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। পরে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে গিয়ে হামের টিকাদান কর্মসূচি ও খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে বাগবাড়ীর শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন। সন্ধ্যায় তিনি বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় ভাষণ দেন।
ই-বেইল বন্ড সিস্টেমের উদ্বোধন: এদিন বেলা ১১টায় বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড (ইলেকট্রনিক জামিননামা) সিস্টেমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বগুড়াসহ সাত জেলায় এই ই-বেইল বন্ড সিস্টেম চালু হলো। এছাড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
ই-বেইল বন্ড সিস্টেমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ তাদের হারানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার ফেরত পেয়েছে। আর কখনো যাতে কোনো স্বৈরাচার কিংবা তাঁবেদার জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় জনগণের হয়রানি লাঘব করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিচার, প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ই-বেইল বন্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। দেশের সব আদালতে ই-বেইল বন্ড পদ্ধতি চালু করা গেলে জনগণের বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব ও বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, জামিন প্রক্রিয়ায় ই-বেইল বন্ড ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। এ পদ্ধতির মাধ্যমে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই জামিননামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাওয়ার ফলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি লাঘব হবে।
তিনি বলেন, ‘আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে জেলখানায় পৌঁছানো পর্যন্ত আইনজীবী, মুহরি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, পিয়নসহ নানা পরিক্রমায় কমপক্ষে ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। ই-বেইল বন্ড পদ্ধতি চালুর পর এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে জামিননামা কিছু সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে। এ কারণে বর্তমান সরকার সারা দেশের সব আদালতকে ই-বেইল বন্ড পদ্ধতির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘এরই অংশ হিসেবে আজ থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া এ কয়টি জেলায় আদালতের কার্যক্রমে ই-বেইল বন্ড পদ্ধতি চালু হলো। ফলে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারামুক্তির ক্ষেত্রে হয়রানি লাঘব হবে। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা কিংবা জামিননামা জালিয়াতির ঘটনার সুযোগও কমে যাবে।
তিনি বলেন, ‘একজন বিচারক যেহেতু জামিন আদেশটি যাচাই করে সরাসরি অনলাইনেই কারা প্রশাসনের কাছে পাঠাবেন সেহেতু কারা প্রশাসন জামিন আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারামুক্তি দিতে সক্ষম হবেন। ফলে ই-বেইল বন্ড বা ইলেকট্রনিক জামিননামা ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থায় জনগণের অহেতুক হয়রানি এবং দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থায় অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমেই প্রডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করবে। এটি করা সম্ভব হলে এক জেলার অভিযুক্ত আসামি অন্য জেলায় গ্রেফতার হলে অনলাইনে দ্রুত ‘‘উপনথি’’ প্রেরণের মাধ্যমে জামিন শুনানি সহজ করা হবে। ফলে পুলিশি হয়রানি ও ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বন্দি করে রাখার যে অপসংস্কৃতি, তা উৎপাটন করা সম্ভব হবে।’
বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন করেছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পৌর ভবনে তিনি এ ফলক উন্মোচন করেন। ফলে প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড়শ বছর পর বগুড়া পৌরসভা সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পেল। এটি দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন।
ফলক উন্মোচন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের অনেকদিনের দাবি ছিল, সেটি আজ পূরণ হলো। বগুড়া সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করল। বগুড়াকে একটি মডেল টাউনে পরিণত করার যে দাবি তা সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়া সদর (বগুড়া-৬) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সেখানে গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ: বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় ৯১১ জনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুরে উপজেলার বাগবাড়ীতে শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে এ কার্ড বিতরণ করেন সরকারপ্রধান।
নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবারের জীবনমানের উন্নয়নে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে গত ১০ মার্চ ঢাকায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান।
খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন: বাগবাড়ীতে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকাল পৌনে ৪টার দিকে নশিপুরে সরকারপ্রধান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চৌকিদহ খালের খনন কার্যক্রমের সূচনা করেন। এ সময় বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোরশেদ মিলটন, জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি মো. হেলালুজ্জামান তালুকদার উপস্থিত ছিলেন।