সম্প্রতি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিকাশ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘অন্তর্দৃষ্টি’-তে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত সম্পর্কে বলুন।
একটা সময় ছিল যখন সাধারণ একটি এনজিওগ্রাম করার জন্য মানুষকে ভারতে যেতে হতো, কিন্তু আজ বাংলাদেশে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬৫ শতাংশকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে বেসরকারি খাত। ১৮ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এ দেশে রাষ্ট্রের একার পক্ষে বিশাল এ চাপ সামাল দেয়া সম্ভব নয়; আর সেই অভাববোধ থেকেই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্ম। শুরুতে বিত্তবানরা মূলত গার্মেন্টস ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেখানে একটি মেরুকরণ এসেছে এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বেড়েছে। যে চিকিৎসা মানুষ দেশের বাইরে গিয়ে কোটি টাকায় করাচ্ছে, আমরা সেটি দেশেই কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছে দিচ্ছি। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছে দেয়ার সেই লক্ষ্য ও সম্ভাবনা নিয়েই মূলত আমাদের এ পথচলা।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে আসে সেটি হলো চিকিৎসা ব্যয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আপনি এ খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বাংলাদেশে চিকিৎসার খরচ বেশি—এ ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং পার্শ্ববর্তী ও অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে চিকিৎসার ব্যয় অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ, হার্টের বাইপাস সার্জারি বাংলাদেশে যেখানে প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকায় করা সম্ভব, ভারতে সেটি ৪ থেকে ১০ লাখ এবং থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুরে এটি আরো বেশি এবং উন্নত দেশগুলোতে তা কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়। আসলে মূল সমস্যা খরচে নয়, সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার অভাব। উন্নত দেশগুলোতে এটি বাধ্যতামূলক, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ এখনো এতে অভ্যস্ত নন।
দেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে কেন যাচ্ছে?
এটি একটি আপেক্ষিক প্রশ্ন। আমি তো বিদেশ যাই স্বাস্থ্যসেবার ধরন দেখতে। যখন বাংলাদেশের অনেক রোগীকে স্বনামধন্য হাসপাতালের ফাইলসহ দেখি তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করি যে আপনি এই চিকিৎসার জন্য এখানে এলেন কেন?
স্বীকার করতে বাধা নেই যে কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসা—যেমন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা অন্যান্য অরগান ট্রান্সপ্লান্ট—বাংলাদেশে এখনো সেভাবে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শুরু হয়নি। তবে আশার কথা হলো আমরা এখন সাশ্রয়ী মূল্যে এসব সেবা দেশে চালুর লক্ষ্যেই এগোচ্ছি। মূলত উন্নত প্রযুক্তি, চিকিৎসকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপনের সুযোগ এবং মানসিক আত্মতুষ্টির খোঁজেই মানুষ এখনো বিদেশে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশেই সেই আস্থার পরিবেশ এবং উন্নত প্রযুক্তি নিশ্চিত করা।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত নীতিগতভাবে সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছে কি? বাস্তবে আসলে এটার কার্যকারিতা কতটা দেখতে পাচ্ছেন?
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত নিজের ইচ্ছেমতো চলে—এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। শিক্ষা থেকে শুরু করে সেবার মূল্য নির্ধারণ, সবকিছুই রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অধীনে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি এখন সম্পূর্ণ জাতীয় মেধার ভিত্তিতে হয়। এমবিবিএস বা নার্সিং কোর্সের ফি (যেমন—এমবিবিএসে প্রায় ২১ দশমিক ৪০ লাখ টাকা) এটি সরকারই নির্ধারণ করে দিয়েছে। মজার বিষয় হলো নেপাল বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে অত্যন্ত কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের (ব্রিটিশ কারিকুলাম অনুসরণকারী) চিকিৎসা শিক্ষা দেয়া হয়। এ কারণেই প্রচুর বিদেশী শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে। বেসরকারি হাসপাতালে সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, ডেঙ্গু পরীক্ষা, সিবিসির মতো পরীক্ষার রেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ক্যাটাগরি অনুযায়ী নির্ধারণ করে দেয়। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে ১০ টাকার টিকিটে বিশেষজ্ঞ দেখানোর যে সুযোগ বাংলাদেশে আছে, তা বিশ্বের অন্যত্র বিরল। তবে এ সুবিধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবীমা অপরিহার্য।
দেশের সব হাসপাতালের মান কি এক? একই রোগের চিকিৎসায় একেক বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়ের বা প্রটোকলের ভিন্নতার কারণটা কী?
আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোর ব্যয় এবং প্রটোকল ভিন্নতার প্রধান কারণ হলো সেবার মান এবং সরঞ্জামের গুণগত পার্থক্য। হাসপাতালগুলো সাধারণত এ, বি বা সি গ্রেডে বিভক্ত থাকে। যেমন—একটি সাধারণ মানের চাইনিজ মনিটর যেখানে ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে আমরা ফিলিপস জিইর মতো উন্নতমানের মনিটর ব্যবহার করি, যার দাম ৪ লাখ টাকার বেশি। একইভাবে ৫-৭ লাখ টাকার ভেন্টিলেটরের পরিবর্তে আমরা সুইজারল্যান্ড বা ব্রাজিলের ২০ লাখ টাকা বা ততোধিক মূল্যের মেশিন ব্যবহার করছি। ব্যয় বাড়ার আরো কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আমাদের এখানে ২৪ ঘণ্টা কার্ডিওলজিস্ট, সার্জন, অ্যানেসথেসিস্ট এবং ট্রমা সার্জনসহ সব বিভাগের বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করা হয়। মানসম্মত সেবার জন্য আমরা প্রতিটি বেডের বিপরীতে পর্যাপ্ত নার্স ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ করি। তবে আমরা সব স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখে কাজ করছি।
আপনাদের হাসপাতালে বিশেষ করে স্বচ্ছ এবং পূর্বঘোষিত খরচ কাঠামো নিশ্চিত করতে কোনো পদক্ষেপ আছে কি?
জি আছে। আমাদের হাসপাতালে রোগী ভর্তির সময়ই তাকে সম্ভাব্য বেসিক খরচ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়া হয়। তবে ওষুধের বিষয়টি আলাদা; কারণ রোগীর অবস্থা ভেদে কার কোন ওষুধ বা কতগুলো টেস্ট লাগবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। খরচ বাড়া বা কমার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। কিছু জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশন বা ওষুধের দাম এক সময় অনেক বেশি ছিল। তবে এখন অনেক দেশী কোম্পানি সাশ্রয়ী বিকল্প আনায় খরচ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। রোগী যত বেশি সংকটাপন্ন হন, খরচ তত বাড়ে। যেমন—জরুরি মেডিকেল বোর্ড গঠন, দামি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা দিনে কয়েকবার ‘এবিজি’ পরীক্ষার প্রয়োজন হলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের পরিধি যতটা বাড়ছে, সমান্তরালভাবে এ খাতের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সচেতনতা সেভাবে বাড়ছে?
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মান রক্ষার বিষয়টি মূলত নির্ভর করে উদ্যোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি ও ম্যানেজমেন্টের ওপর। আমার হাসপাতালে টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগে ডাক্তার ও অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য চিফ মেডিকেল অফিসার এবং নার্সিং ইনচার্জরা কাজ করছেন। যেহেতু আমি নিজে একজন ডাক্তার, তাই পেশাদারত্ব বজায় রাখা এবং কোনো দুর্ঘটনা এড়ানোই আমার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে এ সংবেদনশীল খাতটি অনেক ক্ষেত্রে নন-প্রফেশনাল বা অপেশাদারদের হাতে চলে গেছে।
আপনার হাসপাতালে চিকিৎসা প্রটোকল ও রোগী নিরাপত্তা কাঠামো কি কোনো আন্তর্জাতিক বা স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করে?
আমাদের হাসপাতালটি একটি আইএসও সার্টিফায়েড প্রতিষ্ঠান। আইএসওর নীতিমালা অনুযায়ী, রোগীর নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং কমপ্লায়েন্স আমরা শতভাগ অনুসরণ করি। হাসপাতালে মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে, তবে প্রতিটি মৃত্যুকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করি। আমাদের একটি শক্তিশালী ডেথ রিভিউ কমিটি রয়েছে। যদি কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো মৃত্যু ঘটে, তবে আমাদের বিশেষজ্ঞ বডি তাৎক্ষণিকভাবে তা পর্যালোচনা করে দেখে যে সেখানে কোনো ঘাটতি ছিল কিনা। চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে আমাদের নিজস্ব একটি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলের সাবেক প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাসানুজ্জামান আমাদের রিসার্চ এবং পাবলিকেশন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রোগ এবং সেগুলোর নিরাময় নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করছি। আমাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ও তথ্যগুলো আমরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালগুলোতে প্রকাশ করি।
স্বাস্থ্যবীমা এখনো জনপ্রিয় নয়। এজন্য কি কেবল জনগণের অজ্ঞতা দায়ী, নাকি হাসপাতাল ও বীমা কোম্পানির সমন্বয়ের ঘাটতি আছে? আপনারা কোনো সমন্বিত মডেল ব্যবহার করেন কিনা?
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবীমা জনপ্রিয় না হওয়ার প্রধান কারণ জনগণের অজ্ঞতা নয়, বরং বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর অবিশ্বাস ও অনাস্থা। অতীতে কিছু মানহীন কোম্পানি গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করায় এ আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইড্রাকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। যারা মানুষের টাকা মেরে দিয়েছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে শাস্তির আওতায় আনলে মানুষের আস্থা ফিরবে। বর্তমানে মেটলাইফ, গার্ডিয়ান বা প্রগতির মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে কাজ করছে, যা ইতিবাচক। স্বাস্থ্যবীমাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এর সুফলগুলো আরো ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।
যদি সরকার বেসরকারি হাসপাতালের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা মূল্যসীমা নির্ধারণ করে আপনার অবস্থান কী হবে?
আসলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এরই মধ্যে এটি অনুসরণ করছি। যেমন—হার্টের রিং বা স্টেন্টের দাম এখন সরকার সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। একটি রিংয়ের দাম আগে অনেক বেশি থাকলেও এখন তা ৬০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সরকার যদি বেসরকারি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসার মূল্যসীমা বেঁধে দেয়, তবে আমরা সেটিকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানাই। সবচেয়ে বড় কথা হলো সরকার নির্ধারিত এ দামে রিং বিক্রি করতে গিয়ে আমাদের কোনো লাভ থাকছে না, কিন্তু আমরা এতে খুশি যে সুবিধাটি সরাসরি রোগী পাচ্ছেন। আমরা চাই সরকার অন্যান্য চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এমন একটি যৌক্তিক মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিক। তবে এ সীমা নির্ধারণের সময় হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় এবং সেবার মান বিবেচনা করে তা যেন বাস্তবসম্মত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে করছাড় ও প্রণোদনার কথা ওঠে। কিন্তু এর বিনিময়ে সেবার মান ও সাশ্রয়ী ব্যয়ের যে সামাজিক দায়বদ্ধতা সেটা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?
আমরা মুখে স্বাস্থ্যকে সেবা খাত বললেও বাস্তবে বাণিজ্যিক খাতের মতোই সব খরচ মেটাতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের বিদ্যুৎ ও পানির বিল বাণিজ্যিক হারে দিতে হয়, এমনকি জায়গার ভাড়ায় বাণিজ্যিক অফিসের সমান। বিদেশের মতো আমরা স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাই না। আমাদের ১৫-১৬ শতাংশ সুদে লোন নিতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের রিটার্ন আসতে কমপক্ষে ১০ বছর সময় লাগে, যেখানে শুরুতেই বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন। সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের কিছু রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকে সেবা খাত হিসেবে ঘোষণা করে বিদ্যুৎ-পানিসহ সব বিলে বিশেষ ছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত। যেকোনো লোনের ক্ষেত্রে অন্তত তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা ব্রিদিং টাইম দেয়া প্রয়োজন।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। দেশব্যাপী এ বিকাশের সুষম বণ্টন কীভাবে সম্ভব?
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক—এ ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ঢাকার বাইরেও এখন ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আমার নিজের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই বর্তমানে প্রায় ১০০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। সেখানে আমাদের একটি সেন্টারে আধুনিক ল্যাব ও সিটি স্ক্যান সুবিধা আছে; এমনকি শহরে আইসিইউ এবং কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবের সুবিধাও আছে। ঢাকার ওপর রোগীর চাপ কমাতে এবং সেবার মান বাড়াতে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি জেলা শহরে আইসিইউ এবং সিসিইউ সুবিধা সরকারিভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব—পিপিপি নিয়ে অনেকদিন যাবত আমরা আলোচনায় শুনছি, এটার বাস্তবতা আসলে কেমন দেখছেন?
বাংলাদেশে মেট্রোরেল বা পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে পিপিপি সফল হলেও স্বাস্থ্য খাতে এর প্রয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়। অথচ সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবায় এ মডেলটি খুবই জনপ্রিয়। আমাদের দেশে যদি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বিভাগীয় শহরগুলোতে এটি চালু করা যেত, তবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসত।
বেসরকারি খাতের উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা বাণিজ্যকে কতটুকু আর সেবার মানকে কতটুকু অগ্রাধিকার দেয়?
বাণিজ্য শব্দটিকে শুধু নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যসেবাও একটি প্রতিষ্ঠান এবং এখানে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই হাজার কর্মী এবং আমার নিজের আয় এর ওপর নির্ভরশীল। তাই আয়ের উৎস হিসেবে এটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে মূল প্রশ্নটি হলো—কেউ কোনো অন্যায়, দুর্নীতি বা অবিচার করছে কিনা। আমরা নিয়মিত স্টাডি করি এবং দেখা যায় যে আমাদের হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বাকিদের অসন্তুষ্টির কারণগুলো চিহ্নিত করে আমরা তা সমাধানের চেষ্টা করি। দিনশেষে মানুষের এ আস্থাই প্রমাণ করে যে আমরা বাণিজ্যের চেয়ে সেবাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।
আপনাদের মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালটি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আপনার ভিশন জানতে চাই।
২০০০ সালে এমবিবিএস পাসের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিফ মেডিকেল অফিসার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি। ২০০৪ সালে মাত্র ৫০ শয্যার আয়েশা মেমোরিয়াল হসপিটাল কিনে নেয়ার মাধ্যমে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৩৫০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আমাদের ৫০০ শয্যার ‘ইউনিভার্সাল দ্য মেডিসিটি’ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে চলছে, যেখানে উন্নত বিশ্বের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা থাকবে। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভিশনের মূল দিকগুলো হলো বর্তমানে মহাখালীতে আমাদের ওয়ান-স্টপ কার্ডিয়াক সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা ক্যাথল্যাব ও প্রাইমারি পিসিআই সুবিধা রয়েছে। লন্ডনের কোনো হাসপাতালে বা বিশ্বের কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকের পর যে জরুরি চিকিৎসা পান, আমরা তা দেশেই ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা নিশ্চিত করছি। শুধু হাসপাতাল পরিচালনা করছি না, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আশুতোষ চক্রবর্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি এবং এক যুগ ধরে মায়েদের সম্মানে ‘গরবিনী মা’ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছি। এছাড়া এ বছর থেকে কৃতী নবীন চিকিৎসকদের জন্য আমরা ‘টপ টেন জিনিয়াস ডক্টর’ সম্মাননা চালু করেছি। ফাইভ স্টার স্ট্রাকচার হলেও আমাদের মূল ফোকাস হলো ৮৫ শতাংশ নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সেবা নিশ্চিত করা, যারা ব্যয়বহুল হাসপাতালে যেতে পারেন না, আবার সরকারি হাসপাতালের ভিড়েও জায়গা পান না, তাদের জন্য ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি আস্থার মাইলফলক হয়ে থাকবে।