উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও বাজারে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় প্রতি কেজি আলুতে ৩ টাকারও বেশি ক্ষতি গুনতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় আলু বিক্রি না করে হিমাগারেও রাখতে পারছেন না তারা। কারণ চলতি বছর রংপুরে যে পরিমাণ আলুর উৎপাদন হয়েছে, তার ৭৮ শতাংশ আলু রাখার হিমাগার নেই। এতে চাষীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা, আর ভবিষ্যতে চাষে আগ্রহ কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রংপুর ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে (২৫-২৬) মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের (২০২৪-২৫) চেয়ে ২১ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমি কম। চলতি মৌসুম আলু উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন। গত বছরে উৎপাদন হয়েছিল ৫৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩৯ টন।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১১৫টি (কোল্ড স্টোরেজ) হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন। মজুদ ছিল প্রায় ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৫ টন। প্রতি কেজি আলুর জন্য কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ দশমিক ২৫ টাকা। চলতি বছরের উৎপাদন (৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন) ও হিমাগারের ধারণক্ষমতা (১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন) তুলনা করলে দেখা যায় মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ আলু সংরক্ষণ করা যায়। তবে এবার রংপুরে দুটি এবং কুড়িগ্রামে একটি কোল্ড স্টোরেজ নতুন নির্মিত হয়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ধারণক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলু আবাদে খরচ হয়েছে ১৩ টাকারও বেশি। বর্তমানে এলাকাভেদে পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৯ থেকে ১০ টাকা প্রতি কেজি। এতে প্রতি কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে ৩ টাকার বেশি।
কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচের পাশাপাশি কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করতে অস্থায়ী শেড তৈরি করে দিলে অনেক কৃষক আলু রেখে উপকৃত হতেন। নিজের জায়গা না থাকায় বর্তমানে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে আলু রেখেছেন তারা। সেখানে তাদের প্রতিনিয়ত ভাড়া গুনতে হওয়ায় অনেকেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের এলাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজুল্লাহ এলাকার কৃষক পঙ্খিরাজ রায়। এ বছর ১৬ দোন (২৪ শতকে এক দোন) জমিতে এস্টারিক ও সানশাইন জাতের আলু রোপণ করেছেন। প্রতি দোন জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। দোনে আলু পেয়েছেন ২ হাজার ৭০০ কেজি। সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন বিদেশে রফতানির উদ্দেশ্যে আবাদ করা আট দোন জমির সানশাইন আলু নিয়ে। তিনি অভিযোগ করেন, আবাদ করে লাভ করা দূরের কথা, আসল তোলা নিয়েই কষ্ট করতে হচ্ছে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামের কৃষক ওসমান গনি বলেন, ‘সরকারের উচিত আলুর একটি সর্বজনীন দাম ঠিক করে দেয়া। আলু রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও তা নানা জটিলতায় প্রতি বছর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগে রফতানিযোগ্য আলুর আবাদ কম হওয়া প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা অন্যতম বাধার মধ্যে একটি।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলা থেকে এখন পর্যন্ত ১২৬ টন আলু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রফতানি হয়েছে। গত বছরের রফতানি হয়েছিল ৩৫৩ টন।
আলু রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এ খাতে সরকারিভাবে প্রত্যক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা না করলে রংপুর বিভাগের ব্যাপক আলুচাষীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসবে না।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি এলাকায় অবস্থিত উত্তমাশা কোল্ড স্টোরেজের প্রোপ্রাইটর মো. ওবায়দুল বুলু বলেন, ‘সবসময় চাই কৃষকরা লাভবান হোক। তাদের স্টোরেজে ২ লাখ ২০ হাজার বস্তা রাখা যায়। এক মৌসুমে আলু রাখতে নিম্নে দেড় কোটি টাকা শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে তেল খরচ এবং লোকবলের বেতন তো আছেই। গত বছর আলুর মূল্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের ১০ হাজার আলুর বস্তা স্টোরেজ থেকে বের করেননি। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’ এবার আলু রাখার জন্য স্টোরেজ ভাড়া কত নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো নতুন কোনো ভাড়া নির্ধারণ হয়নি।’
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর আলুচাষীদের ক্ষতি হবে না লাভ হবে তা বলার সময় এখনো আসেনি।
বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতি বছর আলু আবাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, এর বেশি আলুর আবাদ করা কৃষকের উচিত নয়। কিন্তু কৃষকরা প্রতিযোগিতা করে একই ফসল আবাদের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।