গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গোবিপ্রবি) ১৭ বছরেও কাটেনি আবাসন সংকট। প্রতি বছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বাড়েনি হলের সংখ্যা। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ হাজার ৩২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচ আবাসিক হলে সিট পেয়েছেন ২ হাজার ১৬০ জন। বাকি ৭ হাজার ১৬০ শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসের আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় মেস ও ভাড়া বাসায়। সে হিসাবে আসন সংকটে ৭৬ দশমিক ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীই হলের বাইরে থাকছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসিক হলের পর্যাপ্ত আসন না থাকায় বিকল্প হিসেবে মেসে থাকতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা তাদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তারা আবাসন সংকটের বিষয়ে অবগত আছেন। এটি সমাধানে তারা কয়েকটি আবেদন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়টি অনুষদের অধীনে ৩৩টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আবাসিক হলগুলোর মধ্যে বিজয় দিবস হলে ৪০০টি, স্বাধীনতা দিবস হলে ৩৬২, শহীদ তিতুমীর হলে ৬০৮, বনলতা হলে ৩৪০ ও অপরাজিতা হলে ৪৫০টি আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচটি হলে মোট আসন ২ হাজার ১৬০টি।
বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের আবাসন চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে মেস ব্যবসা গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ভাড়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মেস মালিকদের বিভিন্ন ধরনের শর্ত মেনে নিয়েই থাকতে হচ্ছে তাদের। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসন সংকট আরো বাড়ছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মেস বা ভাড়া বাসার অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ও ভবিষ্যৎ ভর্তি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ এবং আসন সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী লাবিবা তাসফিয়া বলেন,"‘মেয়েদের জন্য আবাসিক হলে আসন ৮০০টিরও কম, যা শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল। এর ওপর একটি ছাত্রী হল এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে অনেককেই বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়তি আর্থিক চাপের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় এক ধরনের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কাজ করে; বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রম শেষে বাসায় ফেরার সময়।’ তিনি মেয়েদের জন্য দ্রুত নতুন হল নির্মাণ ও অসম্পূর্ণ হলটি সম্পন্ন করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবস হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় পাঁচটি আবাসিক হলে আসন সংখ্যা অনেক কম। ফলে চাইলেও অনেক সময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা দেয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া শিক্ষার্থীরা আবাসনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে এলেও আসন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি।’ তার মতে, ছেলেদের জন্য আরো তিনটি ও মেয়েদের জন্য দুটি হল নির্মাণ করা গেলে আবাসন সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহেল হাসান বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আবাসন সংকট সমাধানে আমরা এরই মধ্যে একটি একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, একটি ছেলেদের হল ও একটি মেয়েদের হল নির্মাণের জন্য আবেদন করেছি। ইউজিসি থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ সংকট অনেকটা নিরসন হবে।’"
তিনি আরো বলেন, ‘২৫৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ওই প্রকল্পের আওতায় একটি ছাত্রী হলের ওপরের তলার কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এটি সম্পন্ন করা গেলে সেখানে আরো প্রায় ১০০ ছাত্রী আবাসিক সুবিধা পাবেন। আশা করছি, এসব কাজ ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’