মানিকগঞ্জের খারচর, পাবনার ঢালারচর যুক্ত হয়েছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ চরের সঙ্গে। পদ্মা নদীবেষ্টিত তিনটি চরে অন্তত ২০০টি পরিবারের বাস। তবে সেখানে নেই হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি মাত্র বিদ্যালয় থাকলেও অন্তত ১০ কিলোমিটার দূরে। তিনটি চরে বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী অন্তত ১০০টি শিশু রয়েছে, যারা জানেই না বিদ্যালয় কী। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক। নেই বিদ্যুৎ সংযোগও। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, ভৌগোলিক কারণেই অবহেলিত চরাচঞ্চলের মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দ চরে যেতে হলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ছাড়া যাওয়ার কোনো উপায় নেই। পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পানিপথ, যার বেশির ভাগই প্রমত্তা পদ্মার। উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। অন্যদিকে পাবনার বেড়া উপজেলার ঢালারচর থেকে পাকা সড়কে উঠতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। সেখানেও বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া চলাচলের আর কোনো মাধ্যম নেই। মানিকগঞ্জের খারচর থেকে মূল সড়কে যেতে হয় নৌকায়। তাতেও সময় লাগে ২ ঘণ্টা। দূরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় এখানে কমছে শিক্ষার হার।
গোয়ালন্দ চরের বাসিন্দা আলম খান বলেন, ‘পাশাপাশি তিনটি চরে বসবাস করে অন্তত ২০০টি পরিবার। তিন জেলার শেষ প্রান্তে হওয়ায় এখানকার খোঁজ রাখে না কেউ। এখানে নেই বিদ্যুৎ, নেই সড়ক, হাসপাতাল। একটি মাত্র বিদ্যালয় রয়েছে, তাও ১০ কিলোমিটার দূরে। এ কারণে এখানকার অন্তত ১০০টি শিশু যাদের বয়স ৬-১০ বছরের মধ্যে, তারা স্কুলে যায় না। অনেকে আবার বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরার কাজ শুরু করেছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, একসময় এখানে ছিল সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। পদ্মার ভাঙনে সবই বিলীন হয়ে গেছে। তবে প্রকৃতির নিয়মে আবারো জেগে উঠেছে চর। সে চরেই ফিরে এসেছেন বাসিন্দারা। মাঝ পদ্মার চারদিকে অথৈ পানি। তিনদিকে গড়ে উঠেছে তিনটি গ্রাম।
পাবনার ঢালারচরের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এখানকার মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় এক প্রকার অন্ধকারেই থাকতে হয়। বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষাবঞ্চিত শতাধিক শিশু। আবার কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেয়ার একমাত্র বাহন নৌকা। হাসপাতালে নিতে নিতে অনেক সময় রোগী মারাও যায়।’
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ করা একদল মানুষের নজরে আসে চরাঞ্চলটি। তারা তৈরি করেন ‘নিরক্ষরের কারখানা’ নামে একটি কনটেন্ট, যা দেখে সাড়া দেয় সমাজের কিছু মানুষ। চরের শিশুদের শিক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে আমাদের পাঠশালা নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম দিনেই সেখানে ভর্তি হয়েছে ৪৫টি শিশু।
সাংবাদিক এনায়েত মুন্সি বলেন, ‘চর নিয়ে আমরা কাজ করছি। সারা দেশের চরে ঘুরে বেড়াই আমরা। পদ্মার এ চরাঞ্চল আমার কাছে ভিন্ন ধরনের মনে হয়েছে। কারণ এর তিন পাশে তিনটি চর, যা আবার তিনটি জেলার অংশ। অবাক হওয়ার বিষয় হলো চরের বাসিন্দারা এখনো অন্ধকারেই ডুবে আছে।’
আমাদের পাঠশালার মূল উদ্যোক্তা সাংবাদিক মহসিন-উল হাকিম বলেন, ‘চর যখন নদীভাঙনের কবলে পড়ে, তখন সেখানকার বাসিন্দারা অন্য চরে আশ্রয় নেয়। বসতভিটার সঙ্গে নদীতে বিলীন হয়ে যায় চরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অন্ধকার থেকে চরের শিশুদের বের করে আনতেই আমাদের পাঠশালা তৈরি করা হয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একটু নজর দিলেই পাল্টে যেতে পারে খারচর, ঢালারচর ও গোয়ালন্দ চরের মানুষের জীবনযাত্রা।’
এ ব্যাপারে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চরাচঞ্চলের মানুষ ভৌগোলিক কারণেই অবহেলিত। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে তাদের জন্য ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়। এছাড়া এডিপি প্রকল্পে তারা সমান অংশ পায় কিনা সেটার নজরদারি করা হয়। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’