ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবা। অগ্নিকাণ্ডের জন্য কার্গো ভিলেজের ইজারাগ্রহীতা সংস্থা বিমানকে অন্যতমভাবে দায়ী করা হয়েছে। পাশাপাশি বিমানের কার্যক্রম শুধু ফ্লাইট পরিচালনায় সীমাবদ্ধ রাখা এবং একটি দক্ষ অপারেটরের কাছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য কার্যক্রমের দায়িত্বভার অর্পণের সুপারিশ করেছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নেয়া হচ্ছে। তবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে বিমানকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে বিকল্প অপারেটর নিয়োগ করে এ খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে সূত্রটি।
অবশ্য তদন্ত কমিটির এ সুপারিশের সঙ্গে একমত নন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তারা বলছেন, অব্যবস্থাপনার কারণে কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এবং এর দায় বিমানের কর্মকর্তাদের। এ ঘটনার জন্য সংস্থাটির কার্যক্রম সীমিত করে আনা কোনো সমাধান হতে পারে না। তবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমানের বিকল্প থাকা উচিত বলেও তারা মত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি দেশের সবক’টি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবা দিয়ে আসছে জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। শাহজালাল বিমানবন্দরে নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালেও দুই বছরের জন্য বিমানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ছাড়াও কার্গো পরিষেবা, বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের মাধ্যমে (বিএফসিসি) বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনসে খাবার সরবরাহ, বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্সের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টারের (বিএটিসি) মাধ্যমে এভিয়েশন খাতে দক্ষ কর্মী তৈরির কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তদন্ত কমিটির সুপারিশে বিমানের কার্যক্রমকে শুধু ফ্লাইট পরিচালনায় সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। সুপারিশে বিমানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে ‘সরিয়ে’ দেয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও সংস্থাটির অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির এ সুপারিশ সম্পর্কে মন্তব্য জানার জন্য গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করেও বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাফিকুর রহমানের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বিমানের মুখপাত্র ও পরিচালক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলামও।
এদিকে তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নেয়ার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশগুলোতে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো সংস্থার জন্যই “এক্সক্লুসিভ ক্যাপাসিটি” ভালো নয়। এটা সংস্থাকে দুর্বৃত্তায়নের দিকে ঠেলে দেয়। বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবার ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে চাই। এখানে বিমানও থাকবে। বিমানের সঙ্গে অন্য অপারেটরকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
বিমানবন্দর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের একটি অংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং। বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ অবতরণের পর পথ দেখিয়ে পার্কিং বেতে নেয়া, দরজায় সিঁড়ি লাগানো, যাত্রীদের মালপত্র ওঠানো-নামানো, উড়োজাহাজের ভেতর পরিষ্কার করা, চেকইন কাউন্টারে সেবার মতো কাজ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। ঢাকাসহ দেশের বিমানবন্দরগুলোয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অপেশাদার ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, লাগেজ কাটা ও চুরি, মানহীন চেকইন ও চেকআউট সার্ভিস, স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান, প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে অতিরিক্ত
লাগেজ বহনের চক্রসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে পরিষেবাদাতা সংস্থা বিমানের বিরুদ্ধে।
বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিষেবায় বেশির ভাগ যাত্রীই অসন্তুষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শ্রমিক বিমানে ভ্রমণ করেছেন, জরিপে উঠে এসেছে তাদের ৯৭ শতাংশই সংস্থাটির সেবার মানে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। শুধু যাত্রীরা নন, বাংলাদেশে আসা বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে বিমানের বিকল্প চাইছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ এয়ারলাইনস নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা চায়।
তবে বিমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সংস্থাটির কার্যক্রম শুধু ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে সীমিত রাখার সুপারিশের সঙ্গে একমত নন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোন ব্যবসা করবে আর কোনটি করবে না তা বেঁধে দেয়া কিংবা ব্যবসা সীমিত করে দেয়া পুরোপুরি অযৌক্তিক। কার্গো ভিলেজের আগুনের সঙ্গে বিমানের ব্যবসার কোনো সম্পর্কই নেই। তদন্ত কমিটি কেন এ সুপারিশ করেছে আমি জানি না। অগ্নিকাণ্ডে বিমানের যদি ভুল থাকে, দায়িত্বহীনতা থাকে তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। কিন্তু তার ব্যবসা তো কেউ সীমিত করে দিতে পারে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জানি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে বিমানের ইমেজ সংকট আছে। সংস্থাটির সেবায় যাত্রী, এয়ারলাইনস কেউই খুশি নয়। বিমান যদি এখানে ভালো করতে না পারে, তাহলে অবশ্যই তার বিকল্প আমাদের গড়ে তোলা উচিত ছিল। কিন্তু গত ৫০ বছরে এ উচিত কাজটিই করা হয়নি। অন্যদিকে বিমান কেন গত ৫০ বছরে ভালো সংস্থা হতে পারল না, তার জবাব প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দিতে হবে। আমি সংস্থা হিসেবে বিমানের কোনো দোষ দেখি না। বিমানকে যারা পরিচালনা করেছেন এবং করছেন সব দায়-দায়িত্ব তাদের। বিমানের কার্যক্রম শুধু ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে সীমিত করে আনা কোনো সমাধান হতে পারে না।’